বাংলা তাফসীর

সূরাঃ আল-ফাতিহা - ৭

Alorpath 5 months ago Views:133

সূরাঃ আল-ফাতিহা অনুবাদ ও তাফসির- তাফসীরে জাকারিয়া


সূরাঃ আল-ফাতিহা - ৬

. তাদের পথ, যাদেরকে আপনি নিয়ামত দিয়েছেন(), যাদের উপর আপনার ক্রোধ আপতিত হয়নি() এবং যারা পথভ্রষ্টও নয়()

. এটা আল্লাহর নির্ধারিত সঠিক দৃঢ় পথের প্রথম পরিচয় এর অর্থ এই যে, আল্লাহর নিকট হতে যে পথ নাযিল হয়েছে, তা অনুসরণ করলে আল্লাহর রহমত নিয়ামত লাভ করা যায় দ্বিতীয়তঃ তা এমন কোন পথই নয়, যাহা আজ সম্পূর্ণ নূতনভাবে পেশ করা হচ্ছে- পূর্বে পেশ করা হয় নি বরং তা অতিশয় আদিম চিরন্তন পথ মানুষের এই কল্যাণের পথ অত্যন্ত পুরাতন, ততখানি পুরাতন যতখানি পুরাতন হচ্ছে স্বয়ং মানুষ প্রথম মানুষ হতেই এটা মানুষের সম্মুখে পেশ করা হয়েছে, অসংখ্য মানুষ পথ প্রচার করেছেন, কবুল করার আহবান জানিয়েছেন, এটা বাস্তবায়িত করার জন্য প্রাণপণ সংগ্রাম করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত তারা আল্লাহর নিকট হতে, অপূর্ব নিয়ামত সম্মান লাভের অধিকারী প্রমাণিত হয়েছেন এই নিয়ামত এই দুনিয়ার জীবনেও তারা পেয়েছেন, আর আখেরাতেও তা তাদের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে রয়েছে

মূলত: আল্লাহর নিয়ামতপ্রাপ্ত লোকদের চলার পথ অনুসৃত জীবনই হচ্ছে বিশ্ব মানবতার জন্য একমাত্র পথ পন্থা এতদ্ব্যতীত মানুষের পক্ষে গ্রহণযোগ্য, অনুসরণীয় কল্যাণকর পথ আর কিছুই হতে পারে না কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত লোক কারা এবং তাদের পথ বাস্তবিক পক্ষে কি? এর উত্তর অন্য আয়াতে এসেছে, “যা করতে তাদেরকে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তারা তা করলে তাদের ভাল হত এবং চিত্তস্থিরতায় তারা দৃঢ়তর হত এবং তখন আমি আমার কাছ থেকে তাদেরকে নিশ্চয় মহাপুরস্কার প্রদান করতাম এবং তাদেরকে নিশ্চয় সরল পথে পরিচালিত করতাম আর কেউ আল্লাহ এবং রাসুলের আনুগত্য করলে সে নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ সৎকর্মপরায়ণ (যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন) তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী! এগুলো আল্লাহর অনুগ্রহ সর্বজ্ঞ হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট [সূরা আন-নিসাঃ ৬৬-৭০) আয়াত থেকে সঠিক দৃঢ় জীবন পথ যে কোনটি আর আল্লাহর অনুগ্রহ প্রাপ্ত লোকগণ যে কোন পথে চলেছেন চলে আল্লাহর অনুগ্রহ পাবার অধিকারী হয়েছেন তা সুস্পষ্ট বিস্তারিতভাবে জানা যায় তারা হচ্ছেন আম্বিয়া, সিদ্দীক, শহীদ সালেহীন [ইবন কাসীর]

. এটা আল্লাহর নির্ধারিত সিরাতুল মুস্তাকীম এর দ্বিতীয় পরিচয় আল্লাহ তাআলা যে পথ মানুষের সম্মুখে চিরন্তন কল্যাণ লাভের জন্য উপস্থাপিত করেছেন সে পথ অভিশাপের পথ নয় এবং সে পথে যারা চলে তাদের উপর কখনই আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হতে পারে না সে পথ তো রহমতের পথ বরং সে পথের পথিকদের প্রতি দুনিয়াতে যেমন আল্লাহর অনুগ্রহ সাহায্য বর্ষিত হয়ে থাকে, আখেরাতেও তারা আল্লাহর চিরস্থায়ী সন্তোষ লাভের অধিকারী হবে এই আয়াতাংশের অপর একটি অনুবাদ হচ্ছে, “তাদের পথ নয় যাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ নাযিল হয়েছেএরূপ অনুবাদ করলে তাতেসিরাতুল মুস্তাকীমছাড়া আরও একটি পথের ইঙ্গিত মানুষের সামনে উপস্থাপিত হয়, যা আল্লাহর নিকট হতে অভিশপ্ত এবং সেই পথ হতে মানুষকে রক্ষা করাই এর উদ্দেশ্য মনে হয় কিন্তু এখানে আল্লাহ মূলতঃ একটি পথই উপস্থাপিত করেছেন এবং একটি পথেরই ইতিবাচক দুইটি বিশেষণ দ্বারা সেটাকে অত্যধিক সুস্পষ্ট করে তুলেছেন তাই অনেকেই পূর্বোক্ত প্রথম অনুবাদটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন [উভয় অর্থের জন্য দেখুন, যামাখশারী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] প্রথম অনুবাদ বা দ্বিতীয় অনুবাদ যাই হোক না কেন এখানে একথা স্পষ্ট হচ্ছে যে, আল্লাহর প্রতি ঈমানদার লোকদেরকে প্রকারান্তরে এমন পথ পন্থা গ্রহণ হতে বিরত থাকবার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, যা আল্লাহর অভিশাপের পথ, যে পথে চলে কোন কোন লোক অভিশপ্ত হয়েছে

কিন্তু সে অভিশপ্ত কারা, কারা কোন পথে চলে আল্লাহর নিকট হতে অভিশপ্ত হয়েছে, তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেয়া আবশ্যক কুরআন মজীদ ঐতিহাসিক জাতিদের সম্পর্কে উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়েছেঃআর তাদের উপর অপমান লাঞ্ছনা দারিদ্র্যের কষাঘাত হানা হয়েছে এবং তারা আল্লাহর অভিশাপ প্রাপ্ত হয়েছে[সূরা আল-বাকারাহ: ৬১] পূর্বাপর আলোচনা করলে নিঃসন্দেহে এটা বুঝতে পারা যায় যে, কথাটি ইয়াহুদীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে তাই মাগদুব বলতে যে এখানে ইয়াহুদীদের বুঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে সমস্ত মুফাসসিরই একমত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসেও অনুরুপ স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে [দেখুন, মুসনাদে আহমাদ /৩২,৩৩]


. এটি সিরাতুল মুস্তাকীম'-এর তৃতীয় সর্বশেষ পরিচয় অর্থাৎ যারা সিরাতুল মুস্তাকীম চলে আল্লাহর নিয়ামত লাভ করতে পেরেছেন তারা পথভ্রষ্ট নন-কোন গোমরাহীর পথে তারা চলেন না পূর্বোল্লেখিত আয়াতের ন্যায় আয়াতেরও অন্য অনুবাদ হচ্ছে, তাদের পথে নয় যারা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে, যারা গোমরাহ হয়ে আল্লাহর উপস্থাপিত পথ হতে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস থেকে পথ-ভ্ৰষ্ট লোকদের পরিচয় জানতে পারা যায় যে, দুনিয়ার ইতিহাসে নাসারাগণ হচ্ছে কুরআনে উল্লেখিত গোমরাহ পথ-ভ্ৰষ্ট জাতি [মুসনাদে আহমাদ: /৩২,৩৩, ৭৭] কোন মুসলিম যখন সূরা ফাতিহা পাঠ করে, তখন সে প্রকারান্তরে কথাই ঘোষণা করে যে, “হে আল্লাহ আমরা স্বীকার করি, আপনার সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে যে জীবন-ধারা গড়ে উঠে তা- একমাত্র মুক্তির পথ এজন্য আপনার নির্ধারিত পথে চলে যারা আপনার নিয়ামত পেয়েছেন সেই পথই একমাত্র সত্য কল্যাণের পথ, আল্লাহ সেই পথেই আমাদেরকে চলবার তাওফীক দিন আর যাদের উপর আপনার অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে তাদের যেন আমরা অনুসরণ না করি কেননা, সে পথে প্রকৃতই কোন কল্যাণ নেই বস্তুতঃ পবিত্র কুরআন দুনিয়ার বর্তমান বিশ্বমানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ একমাত্র সর্বশেষ আল্লাহর দেয়া গ্রন্থ এর উপস্থাপিত আদর্শ জীবন পথই হচ্ছে বিশ্বমানবতার একমাত্র স্থায়ী কল্যাণের পথ এর বিপরীত সমস্ত জীবনাদর্শকে মিথ্যা প্রমাণ করে একমাত্র এরই উপস্থাপিত আদর্শের ভিত্তিতে নিজেদেরকে গঠন করা মুসলিমদের একমাত্র দায়িত্ব মুসলিমরা আজও সেই দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ হলে সূরা আল ফাতিহা তাদের জীবনে সার্থক হবে

মূলতঃ যারা সূরা আল-ফাতিহার অর্থ বুঝে সূরা আল-ফাতিহা পাঠ শেষ করার পর তাদের মন থেকে দোআ করবে, আল্লাহ তা'আলা তাদের দোআ কবুল করবেন হাদীসে এসেছে, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, إِذَا قَالَ الْإِمَامُ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ فَقُولُوا آمِينَ فَمَنْ وَافَقَ قَوْلُهُ قَوْلَ الْمَلَائِكَةِ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ  “ইমাম গাইরিল মাগদূবি আলাইহিম ওয়ালাদদ্বলীন বলে তখন তোমরাআমীনবাহে আল্লাহ কবুল করএকথাটি বল; কেননা যার কথাটি ফেরেশতাদের কথা অনুযায়ী হবে তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেয় হবে” [বুখারী: ৭৮২, মুসলিম ৪০৯] অন্য বর্ণনায় এসেছে, وَإِذَا قَالَ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ فَقُولُوا آمِينَ يُجِبْكُمُ الله যখন ইমামগাইরিল মাগদূবি আলাইহিম ওয়ালাদ দ্বলীনবলে তখন তোমরা আমীন বা 'হে আল্লাহ কবুল কর একথাটি বল; এতে আল্লাহ তোমাদের আহবানে সাড়া দিবেন (দোআ কবুল করবেন) [মুসলিম ৪০৪] অন্য একহাদীসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, مَا حَسَدَتْكُمْ الْيَهُودُ عَلَى شَيْءٍ ، مَا حَسَدَتْكُمْ عَلَى السَّلَامِ وَالتَّأْمِينِইয়াহুদীরা তোমাদেরকে সালাম আমীন বলার চেয়ে বেশী কোন বিষয়ের উপর হিংসা করে না” [ইবন মাজাহ: ৮৫৬]



মন্তব্য