সাহাবীদের জীবনী

ইসলামের প্রথম শহীদ সুমাইয়া (রা) একজন মহিলা সাহাবী

Alorpath 2 months ago Views:498

হে আল্লাহ, তুমি ইয়াসিরের পরিবারের কাউকে জাহান্নামের আগুনের শাস্তি দিওনা।


হে ইয়াসিরের পরিবাৰ্গ ধৈর্যধারণ কর। তােমাদের জন্য জান্নাত নির্ধারিত রয়েছে। ইসলামের প্রথম শহীদ সুমাইয়া (রা) একজন মহিলা সাহাবী। তার বংশ পরিচয় তেমন একটা পাওয়া যায় না। ইবনে সা'দ তার পিতার নাম ‘খুব্বাত' বলেছেন, (তাবাকাত-৮/২৬৮) কিন্তু বালাজুরী বলেছেন, ‘খায়্যাত'। (আনসারুল আশরাফ-১১৫৭) প্রখ্যাত শহীদ সাহাবী আম্মার ইবন ইয়াসির (রা)-এর মা এবং মক্কার আবু হুজাইফা ইবন আল-মুগীরা আল-মাখযুমীর দাসী ছিলেন সুমাইয়া (রা)। (তাবাকাত-৮/২৮)

আল-ওয়াকিদীসহ একদল বংশবিদ্যা বিশারদ বলেছেন, আম্মার (রা)-এর পিতা ইয়াসির বনু মাখযুমের আযাদকৃত দাস। ইয়াসির তার দু'ভাই-আল হারিছ ও মালিককে সংগে নিয়ে তাদের নিখােজ চতুর্থ ভাইয়ের সন্ধানে মক্কায় আসেন। আল-হারিছ ও মালিক স্বদেশ ইয়ামনে ফিরে গেলেন, কিন্তু ইয়াসির মক্কায় থেকে যান। মক্কার রীতি অনুযায়ী তিনি আবু হুজাইফা ইবন আল-মুগীরা আল-মাখযুমীর সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে থাকেন। আবু হুজাইফা তার দাসী সুমাইয়া (রা)-কে ইয়াসিরের সাথে বিয়ে দেন এবং তাঁদের ছেলে আম্মারের জন্ম হয়। আবু হুজাইফা আম্মারকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে নিজের সাথে রেখে দেন। যতদিন আবু হুজাইফা জীবিত ছিলেন আম্মারতার সাথেই ছিলেন। (সীরাত ইবন হিশাম-১/২৬১; টীকা -৪; আনসারুল আশরাফ-১/১৫৭) উল্লেখ্য যে, এই আবু হুজাইফা ছিলেন নরাধম আবু জাহলের চাচা। (আল-আ'লাম-৩১৪০)


সুমাইয়া (রা) যখন বার্ধক্যে দুর্বল হয়ে পড়েছেন তখন মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের সূচনা হয়। তিনি প্রথম ভাগেই স্বামী ইয়াসির ও ছেলে আম্মারসহ গােপনে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর প্রকাশ্যে ঘােষণা দেন। মক্কায় তাঁদের এমন কোন আত্মীয়-বন্ধু ছিল না যারা তাদেরকে কুরাইশদের নিষ্ঠুরতার হাত থেকে বাঁচাতে পারতাে। আর তাই তারা তাঁদের উপর মাত্রা ছাড়া নির্যাতন চালাতে কোন রকম ত্রুটি করেনি।

ইমাম আহমাদ ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন : সর্বপ্রথম যারা ইসলামের ঘােষণ দান করেন, তারা সাত জন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ), আবু বকর, আম্মার, আম্মারের মা সুমাইয়া, সুহাইব বিলাল ও আল-মিকদাদ (রা)। আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে তাঁর চাচার দ্বারা এবং আবু বকরকে তাঁর গােত্রের দ্বারা নিরাপত্তা বিধান করেন। আর অন্যদেরকে পৌত্তলিকরা লােহার বর্ম পরিয়ে প্রচণ্ড রােদে দাঁড় করিয়ে রাখতে। (আল-বিদায়-৩/২৮; কানুষ আল উম্মাল-৭/১৪; আল-ইসাবা-৪/৩৩৫; হায়াতুস সাহাবা-১/১২৮৮)

জাবির (রা) বলেন, একদিন মুশরিকরা যখন আম্মার ও তাঁর পরিবারবর্গকে শান্তি দিচ্ছিল তখন সেই পথ দিয়ে রাসূল্লাহ (সাঃ) কোথাও যাচ্ছিলেন। তিনি তাদের অবস্থা দেখে বলেন; হে ইয়াসিরের পরিবার-পরিজন! তােমাদের জন্য সুসংবাদ। তােমাদের জন্যয রয়েছে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি। (হায়াতুস সাহাবা-১/২৯১)

ইবনে আব্বাস (রা)-এর বর্ণনায় একথাও এসেছে যে, সুমাইয়া (রা)-কে আবু জাহল বল্লম মেরে হত্যা করে। অত্যাচার, উৎপীড়নে ইয়াসিরের মৃত্যু হয় এবং আব্দুল্লাহ ইবনে ইয়াসিরকে তীরবিদ্ধ করা হয়, তাতেই তিনি মারা যান।

উছমান (রা) বলেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে ‘আল-বাহা উপত্যকায় হাঁটছিলাম। তখন দেখতে পেলাম, আম্মার ও তার পিতা-মাতার উপর উত্তপ্ত রােদে নির্যাতন চালানাে হচ্ছে। আম্মারের পিতা রাসূল (সাঃ) কে দেখে বলে ওঠেন ইয়া রাসূলুল্লাহ! কালচক্র এ রকম। রাসূল (সাঃ) বললেন, হে ইয়াসিরের পরিবার-পরিজন! ধৈর্য ধর। হে আল্লাহ! ইয়াসিরের পরিবারবর্গকে ক্ষমা করুন। (তাবাকাত-৩/১৭৭; কান্ আল-উল-৭৭২)

সারাদিন এভাবে শাস্তি ভােগ করার পর সন্ধ্যায় তারা মুক্তি পেতেন। শাস্তি ভােগ করে সুমাইয়া প্রতিদিনের মত একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলেন। পাষণ্ড আবু জাহল তাঁকে অশালীন ভাষায় গালি দিতে থাকে। এক পর্যায়ে তার পশুত্বের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায়। সে সুমাইয়া (রা)-এর দিকে বর্শ ছুড়ে মারে এবং সেটি তাঁর যৌনাঙ্গে গিয়ে বিদ্ধ হয় এবং তাতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।(তাবাকাত-৮/২৬৫; আল-বিদায়া-৩/৫৯; সিফাতুস সাফওয়া-২৩২) ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আরো পড়ুন- শহীদের ফজিলত ও মর্যাদা

মায়ের এমন অসহায় অবস্থায় মৃত্যুবরণ ছেলে আম্মারের দুঃখের অন্ত ছিল না। তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট এসে বললেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! এখন তাে জুলুম-অত্যাচারের মাত্রা ছাড়া রূপ নিয়েছে। রাসূল (সাঃ) তাকে ধৈর্য ধরার উপদেশ দিলেন। তারপর বললেন: হে আল্লাহ, তুমি ইয়াসিরের পরিবারের কাউকে জাহান্নামের আগুনের শাস্তি দিওনা। (সীরাত ইবন হিশাম-১৩১৯; টীকা-৫) সুমাইয়া (রা) শাহাদাতের ঘটনাটি হিজরতের পূর্বের। এ কারণে তিনি হলেন ইসলামের প্রথম শহীদ। মুজাহিদ (রহ) বলেন : ইসলামের প্রথম শহীদ হলেন আমারের মা সুমাইয়া। (তাবাকাত-৮/২৬৫; আল-বিদায়া-৩/৫৯; সিফাতুস সাফওয়া-২৩২)

বদর যুদ্ধে নরাধম আবু জাহল নিহত হলে রাসূল (সাঃ) আম্মারকে বললেন : আল্লাহ তােমাদের মায়ের ঘাতককে হত্যা করেছেন। (আল-ইসাবা-৪/৩৩৫) সুমাইয়া (রা)-এর শাহাদাতের ঘটনাটি ঘটে ৬১৫ খ্রীস্টাব্দে। (আল-আ'লাম-৩/১৪০)

- মুয়াল্লিমা মোরশেদা বেগম।



মন্তব্য