সিয়াম

এক নযরে ছিয়াম ও রামাযানের ফাযায়েল

Alorpath 2 months ago Views:1342

হে ঈমানদারগণ! তােমাদের উপর ছিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন তােমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করা হয়েছিল। যাতে তােমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।


ছাওম বা ছিয়াম অর্থ বিরত থাকা। শরী'আতের পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ছুবহে ছাদিক্ব হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যৌন সম্ভোগ হতে বিরত থাকাকে ‘ছাওম’ বা ‘ছিয়াম’ বলে। আল্লাহ তা'আলা এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, 'যখন রামাযানের প্রথম রাত্রি আসে, “হে ঈমানদারগণ! তােমাদের উপর ছিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন তােমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করা হয়েছিল। যাতে তােমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (বাকারাহ ১৮৩)।


আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ছওয়াবের আশায় রামাযানের ছিয়াম পালন করবে, তার বিগত জীবনের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ছওয়াবের আশায় তারাবীহর ছালাত আদায় করবে, তার বিগত জীবনের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ছওয়াবের আশায় কদরের রাত্রি জাগরণ করবে, তার বিগত জীবনের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (বুখারী হা/১৯০১, ১/২৫৫ পৃঃ ও হা/২০০৯, ২০১৪, ১/২৬৯-২৭০ পৃঃ; মুসলিম হা/৭৫৯; আলবানী, মিশকাত হা/১৯৫৮; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৮৬২, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ২১৪-২১৫।)




অন্য হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, 'যখন রামাযানের প্রথম রাত্রি আসে, তখন শয়তান ও অবাধ্য জিন সকলকে শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করা হয়, আর কোন দরজা খােলা। হয় না এবং জান্নাতের দরজাসমূহ খােলা হয়, আর কোন দরজা বন্ধ করা হয় না। এ মাসে এক আহ্বানকারী আহ্বান করতে থাকে যে, হে কল্যাণের অভিসারী! তুমি অগ্রসর হও। হে অকল্যাণের অভিসারী! তুমি থাম। আল্লাহ তা'আলা এই মাসে বহু ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেন। আর এটা প্রত্যেক রাতেই হয়ে থাকে। (তিরমিযী হা/৬৮২, ১/১৪৭ পৃঃ; ইবনু মাজাহ হা/১৬৪২, পৃঃ ১১৮-১১৯; মিশকাত হা/১৯৬০; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৮৬৪, ৪/২১৬ পৃঃ ।)


অন্য হাদীছে এসেছে, প্রত্যেক দিন। ইফতারের সময় আল্লাহ অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেন। (ইবনু মাজাহ হা/১৬৪৩, পৃঃ ১১৯, সনদ ছহীহ।)


অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করা হয় এবং রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়।” (ছহীহ বুখারী হা/১৮৯৮, ১/২৪৪ পৃঃ (ইফাবা হা/১৭৭৭, ৩/২৪১ পৃঃ), হা/৩২৭৭; মুসলিম হা/১০৭৯, ১/৩৪৬ পৃঃ; নাসাঈ হা/২১০০; নাসাঈ হা/২০৯৭; মিশকাত হা/১৯৫৬; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৮৬০, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ২১৪।)


আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, আদম সন্তানের প্রত্যেকটি সৎ আমল ১০ থেকে ৭শ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু মহান আল্লাহ বলেন, ছিয়াম ব্যতীত। কারণ এটা একমাত্র আমার জন্যই রাখা হয়, আর এর প্রতিদান আমি নিজেই দিব। সে আমার জন্যই যৌন বাসনা ও খানা-পিনা ত্যাগ করে। ছিয়াম পালনকারীর জন্য দুটি আনন্দঘন মুহূর্ত রয়েছে। একটা হচ্ছে ইফতারের সময় এবং অন্যটি হচ্ছে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময়। আল্লাহর কাছে ছায়েমের মুখের গন্ধ মিশক-আম্বরের সুঘ্রাণের চাইতেও উত্তম। (ছহীহ মুসলিম হা/১১৫১, ১/৩৬৩ পৃঃ; ইবনু মাজাহ হা/১৬৩৮; মুত্তাফাক্ব আলাহই,ছহীহ বুখারী হা/১৯০৪, ১/২৫৫ পৃঃ; মিশকাত হা/১৯৫৯; বঙ্গানুবাদ মিশকাতহা/১৮৬৩, ৪/২১৫ পৃঃ ।)


আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, অবশ্যই আল্লাহ রামাযান মাসের প্রত্যেক দিন ও রাতে অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেন এবং প্রত্যেক মুমিন বান্দার একটি করে দু'আ কবুল করেন। (আহমাদ হা/৭৪৪৩; ছহীহুল জামে' হা ২১৬৯; ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব হা/১০০২।)


আরো পড়ুন- সমাগত রামাযান, সর্বাত্মক প্রস্তুতির আহ্বান।

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ছিয়াম ও কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। ছিয়াম বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি দিনের বেলায় তাকে পানাহার ও প্রবৃত্তি থেকে বাধা দিয়েছি। তাই তার ব্যাপারে আপনি আমার সুপারিশ কবুল করুন। কুরআন বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি রাত্রে তাকে ঘুমানাে থেকে বাধা দিয়েছি। তাই তার ব্যাপারে আপনি আমার সুপারিশ কবুল করুন। অতঃপর উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে। (বায়হাক্বী, শুআবুল ঈমান হা/১৮৩৯; মিশকাত হা/১৯৬৩, সনদ ছহীহ; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৮৬৬, ৪/২১৭ পৃঃ।)


জ্ঞাতব্য : (ক) রামাযানের প্রথম দশদিন রহমত, দ্বিতীয় দশদিন মাগফিরাত এবং তৃতীয় দশদিন নাজাত বলে মাসকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যাবে না। অনুরূপ রামাযান মাসে একটি সুন্নাত আমল করলে অন্য মাসে ফরয আমল করার মত নেকী হয় এবং একটি ফরয আমল করলে ৭০টি ফরয আমল করার মত নেকী হয়। এ বক্তব্যগুলাে সঠিক নয়। উক্ত মর্মে যে হাদীছ সমাজে প্রচলিত আছে, তা যঈফ ও অগ্রহণযােগ্য। (বায়হাক্বী হা/৩৩৩৬; সিলসিলা যঈফাহ হা/১৫৬৯; মিশকাত হা/১৯৬৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৮৬৮, ৪/২১৭ পৃঃ ।) বরং পুরা মাসই রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস। (ছহীহ বুখারী হা/১৮৯৮, ১/২৫৫ পৃঃ ও হা/৩২৭৭; মুসলিম হা/১০৭৯; মিশকাত হা/১৯৫৬, ইবনু মাজাহ হা/১৬৪২।)


মূলত ছিয়ামের নেকীর সাথে অন্য কোন ইবাদতের তুলনা হয় না। (নাসাঈ হা/২২২৩, সনদ ছহীহ।) এর প্রতিদান সরাসরি আল্লাহ নিজেই দিবেন। (ছহীহ মুসলিম হা/১১৫১, ১/৩৬৩ পৃঃ; ইবনু মাজাহ হা/১৬৩৮; মুত্তাফাক্ব আলাহই, ছহীহ বুখারী হা/১৯০৪, ১/২৫৫ পৃঃ; মিশকাত হা/১৯৫৯।)


(খ) পৃথিবীর যে অঞ্চলে চাঁদ দেখা যাবে, সে অঞ্চলের মানুষ ছিয়াম ও ঈদ করবে। (বাক্বারাহ ১৮৫; ছহীহ বুখারী হা/১৯০৬ ও হা/১৯০৯, ১/২৫৫-২৫৬ পৃঃ (ইফাবা হা/১৭৭৯, ১৭৮৫, ১৭৮৮, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ২৪৪-২৪৫); মুসলিম হা/১০৮১; মিশকাত হা/১৯৭০; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৮৭২ ও ১৮৭৩, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ২২০।) সারা বিশ্বে একই দিনে ছিয়াম ও ঈদ করার দাবী সঠিক নয়।বিস্তারিত দ্রঃ ‘ছিরাতে মুস্তাকীম', 'ছিয়াম ও রামাযান' পর্ব।)


-ডঃ মুজাফফর বিন মহসিন।



মন্তব্য