সিয়াম

ইতিকাফকারীর সাথে সাক্ষাত।

Alorpath 1 month ago Views:245

নিশ্চয় শয়তান মানুষের রক্তের শিরায় বিচরণ করে, আমি আশঙ্কা করছি, সে তােমাদের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিতে পারে।


সাফিয়্যাহ বিনতে হুইয়াই থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফে ছিলেন, আমি রাতে তার সাক্ষাতের জন্য আসি। আমি তার সাথে কথা বলি, অতঃপর রওয়ানা দেই ও ঘুরে দাঁড়াই, তিনি আমাকে এগিয়ে দেয়ার জন্য দাঁড়ালেন। তার ঘর ছিল উসামা ইবন যায়েদের বাড়িতে। ইত্যবসরে দু'জন আনসার অতিক্রম করল, তারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে দ্রুত চলল, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন; থাম, এ হচ্ছে সাফিয়্যাহ বিনতে হুইয়াই। তারা আশ্চর্য হলাে: সুবহানাল্লাহ হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন: নিশ্চয় শয়তান মানুষের রক্তের শিরায় বিচরণ করে, আমি আশঙ্কা করছি, সে তােমাদের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিতে পারে।” (বুখারী-৩১০৭,
মুসলিম-২১৭৫, দ্বিতীয় বর্ণনা বুখারী-২৯৩৪ ও মুসলিমের- ২১৭৫)
আলী ইবনে হাসান (রা) বলেন: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে ছিলেন, তার নিকট তাঁর স্ত্রীগণ উপবিষ্ট ছিলেন, অতঃপর তারা চলে গেলেন। তিনি সাফিয়্যাহ বিনতে হুইয়াইকে বললেন; দ্রুত কর না, যতক্ষণ না আমি তােমাদের সাথে চলি। সাফিয়্যার ঘর ছিল উসামার বাড়িতে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাথে বের হলেন, তার সাথে দু’জন আনসারের সাক্ষাত হলাে, তারা নবীকে দেখল, অতঃপর দ্রুত চলল। তিনি তাদের দু'জনকে বললেন; এ হচ্ছে সাফিয়্যাহ বিনতে হুইয়াই। তারা বলল: সুবহানাল্লাহ! হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন: নিশ্চয় শয়তান মানুষের রক্তের শিরায় বিচরণ করে, আমি আশঙ্কা করছি, সে তােমাদের অন্তরে কিছু সৃষ্টি করতে পারে। (বুখারী-২০৩৮, মুসলিম- ২১৭৫)


শিক্ষা ও মাসায়েল ১৫টিঃ

১. এ হাদীসে উম্মতের ওপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দয়া, তাদের স্বার্থ রক্ষা করা ও তাদেরকে সঠিক নির্দেশনা দেয়ার প্রমাণ মিলে, যাতে রয়েছে তাদের আত্মা ও অন্তরের পরিশুদ্ধতা। কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশঙ্কা করেছেন যে, শয়তান তাদের অন্তরে তাঁর সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি করতে পারে, আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে খারাপ ধারণা কুফর, তাই তিনি তাদের সতর্ক করলেন। (শারহুন নববী- ১৪/৫৬)

ইমাম শাফেঈ (র) বলেন: “তিনি তাদেরকে এ জন্য বলেছেন, কারণ তিনি তাদের ওপর কুফরির আশঙ্কা করেছেন, যদি তারা তার সম্পর্কে কুধারণা করত, তাই তাদের অন্তরে শয়তানের কুমন্ত্রণা সঞ্চার করার পূর্বে, যা তাদের ধ্বংসের কারণ ছিল, তিনি দ্রুত জানিয়ে দিয়ে তাদের হিতকামনা করলেন।

২. ইতিকাফকারীর সাথে সাক্ষাত করা বৈধ, মসজিদে স্ত্রী তার স্বামীর সাথে সাক্ষাত ও কথা বলতে পারবে রাত-দিন যে কোনাে সময়, এতে ইতিকাফের ক্ষতি হবে না। তবে অতিরিক্ত গমনাগমন ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে, কখনাে ইতিকাফ বিনষ্টকারী কর্মে লিপ্ত করে, তাই তা থেকে বিরত থাকা জরুরি।

৩. মুসলিমদের উচিত অপবাদ ও সন্দেহের স্থান থেকে দূরে থাকা, যখন খারাপ ধারণার আশঙ্কা হয় স্পষ্ট করে দিবে যেন তা দূরীভূত হয়ে যায়। বিশেষ করে অনুসরণীয় আলেম ও নেককার লােকদের বিষয়, তাদের এমন কাজ করা বৈধ নয় যা মানুষের অন্তরে সন্দেহের জন্ম দেয়। অনুরূপ বিচারকের বিচার ব্যাখ্যা করে দেয়া উচিত, যদি বিবাদীর নিকট তার কারণ অস্পষ্ট থাকে ও পক্ষপাত তুষ্টের ধারণা জন্মায়।

8. শয়তান ও তার ষড়যন্ত্র থেকে সতর্ক থাকা ওয়াজিব, কারণ সে বনী আদমের রক্তের শিরায় বিচরণ করে। 

৫. আশ্চর্য হয়ে সুবহানাল্লাহ বলা বৈধ। যেমন আয়েশা (রা) আনহার ওপর অপবাদের ঘটনায় আছে: “তুমি অতি পবিত্র মহান, এটা এক গুরুতর অপবাদ।” (সূরা নূর: আয়াত-১৬)

৬. ইতিকাফকারীর বৈধ কাজে লিপ্ত হওয়া জায়েয। যেমন সাক্ষাতকারীকে উৎসাহ দেয়া, তার সাথে দাড়ানাে ও তার সাথে কথা বলা, তবে অতিরিক্ত না করা।

৭. ইতিকাফকারীর পাঠ দান করা, শিক্ষণীয় প্রােগ্রামে অংশগ্রহণ করা ও দ্বীনি বিষয়ে লেখা বৈধ, তবে বেশি পরিমাণে নয়, কারণ ইতিকাফের উদ্দেশ্য হচ্ছে শুধু ইবাদতের জন্য অবসর হওয়া।

৮. ইতিকাফকারী প্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করতে পারবে, যেমন খাবার ইত্যাদি।

৯. স্ত্রীর সাথে ইতিকাফকারী নির্জনে মিলিত হতে পারবে, তবে স্ত্রীগমন থেকে সতর্ক থাকবে।

১০, নিরাপত্তা থাকলে নারীদের রাতে বের হওয়া বৈধ।

১১. যার সাথে তার স্ত্রী রয়েছে, তাকে সালাম দেয়া বৈধ, কারণ কতক বর্ণনায় এসেছে তারা উভয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালম করেছিল, তিনি তাদের বিরত করেননি।

১২. যদি ব্যক্তির সাথে স্ত্রী বা মাহরাম থাকে, সে যে কাউকে সম্বােধন করতে পারবে, বিশেষ করে যদি তার প্রয়ােজন হয়, কোন হুকুম বর্ণনা করা অথবা কোনাে অনিষ্ট দূর করা ইত্যাদি, এটা রুচি বিরােধী নয়।

১৩, কথা বা কোনাে মাধ্যমে ইতিকাফকারী নিজের ওপর খারাপ ধারণা দূর করতে পারবে, অনুরূপ সে হাতের দ্বারা কষ্ট দূর করতে পারবে, যদি কেউতার ওপর সীমালঙ্ঘন করতে চায়। ইতিকাফকারী মুসল্লির চেয়ে বেশি নয়, মুসল্লির জন্য বৈধ তার সামনে দিয়ে অতিক্রমকারীকে বাধা দেয়া, অনুরূপ, ইতিকাফকারী সে ব্যক্তিকে বারণ করতে পারবে, যে তার ওপর সীমালঙ্ন করে, এ জন্য তার ইতিকাফ নষ্ট হবে না।


১৪. একান্ত প্রয়ােজন না হলে ধীরে কাজ করা ও দ্রুততা পরিহার করা, কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বলেছেন: "তােমরা ধীরে চল।"

১৫. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের মাঝে ইনসাফ করতেন। কেননা তাঁর স্ত্রীগণ তার ইতিকাফে তাকে দেখতে এসেছেন, যখন তারা যাওয়ার ইচ্ছা করেন, তিনি সাফিয়্যাহকে বললেন: তাড়াহুড়াে করাে না। সাফিয়াকে থাকার নির্দেশের কারণ সম্ভবত সে অন্যদের চেয়ে দেরীতে এসেছে, তাই তাকে দেরীতে যেতে বলেছেন, যেন তার নিকট অবস্থানের সময় সবার সমান হয়, অথবা তার বাড়ি অন্য স্ত্রীদের বাড়ি থেকে দূরে ছিল, তাই নবী তার ব্যাপারে আশঙ্কা করেছেন। মুসলিমদের উচিত অনুরূপভাবে স্ত্রীদের মাঝে সমতা রক্ষা করা ও তাদের প্রতি যত্নশীল থাকা।



মন্তব্য