সিয়াম

যাকাতুল ফিতর প্রদান করার নিয়ম।

Alorpath 1 month ago Views:291

আমরা যাকাতুল ফিতর আদায় করতাম এক সা' খানা, অথবা এক সা' গম, অথবা এক সা' খেজুর, অথবা এক সা’ পনির, অথবা এক সা' কিশমিশ দ্বারা।


ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “গােলাম, স্বাধীন, পুরুষ, নারী, ছােট, বড় সকল মুসলিমের ওপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক 'সা' তামার (খেজুর), অথবা এক সা' গম যাকাতুল ফিতর ফরয করেছেন এবং সালাতের পূর্বে তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।”

বুখারির অপর বর্ণনায় আছে, নাফে (র) বলেছেন: “ইবনে ওমর ছােট-বড় সবার পক্ষ থেকে তা আদায় করতেন, তিনি আমার সন্তানদের পক্ষ থেকে পর্যন্ত আদায় করতেন। যারা তা গ্রহণ করত, ইবনে ওমর তাদেরকে তা প্রদান করতেন, তিনি ঈদুল ফিতরের একদিন অথবা দু’দিন পূর্বে তা আদায় করতেন।” (বুখারী-১৪৪০)

আবু সাঈদ খুদরি (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমরা যাকাতুল ফিতর আদায় করতাম এক সা' খানা, অথবা এক সা' গম, অথবা এক সা' খেজুর, অথবা এক সা’ পনির, অথবা এক সা' কিশমিশ দ্বারা।” (বুখারী-১৪৩৫, মুসলিম-৯৮৫)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রােযাদারকে অশ্লীলতা থেকে পবিত্র করা ও মিসকিনদের খাদ্যের ব্যবস্থা স্বরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাতুল ফিতর ফরয করেছেন। সালাতের পূর্বে যে আদায় করল, তা গ্রহণযােগ্য যাকাত, যে তা সালাতের পর আদায় করল, তা সাধারণ সদকা।” (আবু দাউদ-১৬০৯, ইবনে মাজাহ-১৮২৭, হাকেম বলেছেন হাদীসটি সহীহ, বুখারীর শর্ত মােতাবেক-১/৫৬৮, আলবানি সহীহ আবু দাউদে হাদীসটি হাসান বরেছেন।)


কায়স ইবনে সাদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “যাকাত ফরয হওয়ার পূর্বে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন, যখন যাকাত ফরয হলাে, তিনি আমাদের নির্দেশ দেননি, নিষেধও করেননি, তবে আমরা তা আদায় করতাম।” (নাসায়ি- ৫/৪৯, ইবনে মাজাহ- ১৮২৮, আহমদ-৬/৬,

শিক্ষা ও মাসায়েল ১৩টি

১. যাকাতুল ফিতর সকল মুসলিমের ওপর ফরয, যা ফরয হয়েছে যাকাতের পূর্বে। যাকাত ফরযের পর পূর্বের নির্দেশের কারণে তা এখনাে ফরয। প্রত্যেক মুসলিমের নিজ ও নিজের অধীনদের পক্ষ থেকে, যেমন স্ত্রী-সন্তান ও যাদের ভরণ-পােষণ তার ওপর ন্যস্ত, যাকাতুল ফিতর আদায় করা।

২. প্রত্যেক মুসলিমের নিজ ও নিজের অধীনদের পক্ষ থেকে, যেমন স্ত্রী-সন্তান ও যাদের ভরণ-পােষণ তার ওপর ন্যস্ত, যাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব।

৩. স্ত্রী-সন্তান যদি কর্মজীবী অথবা সম্পদশালী হয়, তাহলে তাদের প্রত্যেকের নিজের পক্ষ থেকে যাকাতুল ফিতর আদায় করা উত্তম, কারণ তারা প্রত্যেকে যাকাতুল ফিতর প্রদানে আদিষ্ট। হ্যা, যদি তাদের অভিভাবক তাদের পক্ষ থেকে আদায় করে, তাহলে জায়েয আছে, যদিও তারা সম্পদশালী।

৪. যাকাতুল ফিতরের মূল্য দেয়া যথেষ্ট নয়, এটা জমহুর আলেমের অভিমত। কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশ দেননি, তিনি এরূপ করেননি, তাঁর কোনাে সাহাবি এরূপ করেনি, অথচ প্রতি বছর যাকাতুল ফিতর আসত। অধিকন্তু ফকিরকে খাদ্য দিলে সে নিজে ও তার পরিবার তার দ্বারা উপকৃত হয়, অর্থ প্রদানের বিপরীত, কারণ সে অর্থ জমা করে পরিবারকে বঞ্চিত করতে পারে। দ্বিতীয়ত মূল্য আদায়ের ফলে শরিয়তের এ বিধান তেমন আড়ম্বরতা পায় না।

৫. যাকাতুল ফিতর আদায়ের প্রথম সময় আটাশে রমযান, সাহাবায়ে কেরাম ঈদের একদিন অথবা দু'দিন পূর্বে তা আদায় করতেন, সর্বশেষ সময় ঈদের সালাত, যেমন হাদীসে এসেছে।

৬. হকদার ফকির-মিসকিনদের এ যাকাত দিতে হবে, কারণ নবী বলেছেন: “মিসকিনদের খাদ্য স্বরূপ।” প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের দেয়া ভুল যদি তারা অভাবী না হয়, যেমন কতক লােক কুরবানি ও আকিকার গােস্তের ন্যায় যাকাতুল ফিতর পরস্পর আদান-প্রদান করে, এটা সুন্নাতের বিপরীত। কারণ এটা যাকাত, হকদারকে দেয়া ওয়াজিব, কুরবানি ও আকিকার গােস্তের অনুরূপ নয়, যা হাদীয়া হিসেবে দেয়া বৈধ। আরেকটি ভুল যে, কত মুসলিম প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিবারকে যাকাতুল ফিতর আদায় করে, অথচ বর্তমান সে সচ্ছল হতে পারে, কিন্তু পূর্বের ন্যায় যাকাত দিতে থাকে, এটা ঠিক নয়।

৭. নিজ দেশের অভাবীদের যাকাতুল ফিতর দেয়া উত্তম, তবে অন্য দেশে দেয়া জায়েয, বিশেষ করে যদি সেখানে অভাবের সংখ্যা বেশি থাকে, তাদের চেয়ে বেশি অভাবী নিজ দেশের কারাে সম্পর্কে জানা না থাকে, অথবা তার দেশের অভাবীদের দেয়ার অন্য লােক থাকে।

৮. যাকাতুল ফিতরের কতক বিধান ও উপকারিতা :

ক. বান্দার ওপর আল্লাহর নিয়ামত প্রকাশ করা হয়, যেমন তিনি পূর্ণ মাস সিয়ামের তওফিক ও রমযান শেষে পানাহারের অনুমতি প্রদান দিয়েছেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেন: “আর যাতে তােমরা সংখ্যা পূরণ কর এবং তিনি তােমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর বড়ত্ব ঘােষণা কর এবং যাতে তােমরা শােকর কর।” (সূরা বাকারা-১৮৫)

খ. এটা শরীরের যাকাত, যা আল্লাহ পূর্ণ বছর সুস্থ রেখেছেন।

গ, যাকাতুল ফিতর বান্দার রােযাকে অশ্লীলতা থেকে পবিত্র করে, যেমন হাদীসে এসেছে, যাকাতুল ফিতর রােযাদারকে অশ্লীলতা থেকে পবিত্র করে।

ঘ, যাকাতুল ফিতর দ্বারা ফকির-মিসকিনদের প্রতি অনুগ্রহ ও তাদেরকে ভিক্ষা থেকে মুক্তি দেয়া হয়, যেন ঈদের দিন তারাও অন্যান্য মুসলিমদের ন্যায় আনন্দ ও বিনােদন করতে পারে।

ঙ. যাকাতুল ফিতর দ্বারা রােযাদারকে অনুগ্রহ ও অনুদানের প্রতি উৎসাহী করা হয় এবং তাকে লোভ ও কৃপণতা থেকে রক্ষা করা হয় ।

৯, এক মিসকিনকে এক পরিবার বা একাধিক ব্যক্তির সদকাতুল ফিতর দেয়া বৈধ, যেমন বৈধ একজনের সদকাতুল ফিতর কয়েকজনকে ভাগ করে দেয়া।

১০. শেষ রমযানের সূর্যাস্তের ফলে সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে না, কারণ সে ওয়াজিব হওয়ার আগে মারা গেছে। অনুরূপ কেউ যদি সূর্যাস্তের পর জন্মগ্রহণ করে, তার পক্ষ থেকে সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব নয়, তবে মুস্তাহাব।


১১. কর্মচারী ও ভাড়াটে মজুরদের পক্ষ থেকে সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব নয়, তবে চুক্তির মধ্যে তাদের সাথে অনুরূপ শর্ত থাকলে আদায় করতে হবে। হ্যা, অনুগ্রহ ও দয়া হিসেবে তাদের পক্ষ থেকে মালিকের আদায় করা বৈধ।

১২. যদি সদকাতুল ফিতর আদায় করতে ভুলে যায়, ঈদের পর ছাড়া স্মরণ না হয়, তাহলে সে যখন সদকা আদায় করবে, এতে সমস্যা নেই, কারণ ভুলের জন্য সে অপারগ।

১৩. যদি কাউকে সদকাতুল ফিতর ফকিরের কাছে পৌছে দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়, তাহলে ঈদের আগে তার নিকট তা পৌঁছে দেয়া জরুরি। তবে যদি কোনাে ফকির কাউকে সদকাতুল ফিতর তার জন্য সংরক্ষণ করে রাখার দায়িত্ব দেয়, তাহলে ঈদের পর পর্যন্ত তার নিকট তা সংরক্ষণ করা বৈধ।



মন্তব্য