মনীষীদের জীবনী

ইমাম মাহদীর আবির্ভাব। শেষ পর্ব।

Alorpath 3 weeks ago Views:302

ইসলামের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে, মুসলমানদের ভূমিগুলাে শত্রুমুক্ত করতে হবে, জিহাদের বিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে, ইসলামের পতাকা উডডীন করতে সর্বাত্মক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।


ইমাম মাহদীর আবির্ভাব। পর্ব -১


ভুয়া মাহদীদের আবির্ভাব কেন?

ইতিহাস অধ্যয়নে জানা যায় যে,
✓ নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব এবং ক্ষমতার লােভে কেউ কেউ মাহদীত্বের দাবী তুলেছে। যেমন, উবাইদুল্লাহ কাদ্দাহ, ইবনে তুমরূত। অথচ বর্ণিত কোন নিদর্শন তাদের মধ্যে ছিল না।
✓ অতি খােদা-প্রেমিক হওয়ায় মানুষ তাকে মাহদী মনে করেছে। যেমন, মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ (পবিত্র আত্মার অধিকারী)। তাঁর অনেক অনুসারী ছিল। পরে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তিনি মাহদী নন।
✓ কারাে কারাে ক্ষেত্রে স্বপ্ন-দর্শনের ঘটনা ঘটেছে। ফলে মানুষ তাকে মাহদী মনে করতে শুরু করেছে। যেমন, মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ কাহতানী।

স্বপ্ন নিয়ে দু-টি কথাঃ
নির্দিষ্ট কোন স্বপ্নের উপর শরীয়তের বিধি-বিধান নির্ভরশীল নয়। বিচারক শারীক বিন আব্দুল্লাহ খলীফার দরবারে উপস্থিত হয়ে খলীফাকে রাগান্বিত দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন- কি হয়েছে আপনার হে আমীরুল মুমেনীন? খলীফা বললেন- গতরাতে স্বপ্নে দেখেছি- তুমি আমার বিছানায় আরােহণ করেছ। ব্যাখ্যাকার -তুমি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে- স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিল। তখন শারীক বলতে লাগলেন- হে আমীরুল মুমেনীন! স্বপ্নটি নবী ইবরাহীম আ.-এর স্বপ্ন নয় আর ব্যাখ্যাটি-ও নবী ইউসূফ আ.-এর ব্যাখ্যা নয়!! ব্যক্তিগত স্বপ্ন যদি এরকম ভুল ও খণ্ডিত হতে পারে, তবে সমগ্র মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দর্শিত স্বপ্নও ভুল ও খণ্ডিত হতে পারে।


স্বপ্নে পুত্রকে জবাই করছে দেখে বাস্তবেই পুত্রকে জবাই করে দিল এক পিতাঃ
পত্রিকায় সংবাদটি দৃষ্টিগােচর হয়েছিল- আফ্রিকায় জনৈক পিতা একরাতে স্বপ্নে তার ছেলেকে জবাই করতে দেখে। সকালে ঘুম থেকে উঠে ঠিক-ই ছেলেকে সে জবাই করে দেয়। সে ভেবেছিল, ছেলের স্থলে দুম্বা জবাই হবে। যেমনটি ইবরাহীম আ.-এর পুত্র যবেহ-র ক্ষেত্রে হয়েছিল।
গণ্ডমূর্খ এ ব্যক্তিকে জবাইয়ের কারণ জিজ্ঞেস করা হলে বলতে থাকে, নবী ইবরাহীম আ.-এর সুন্নত পালনার্থে আমি তা করেছি। কারণ, ইবরাহীম আ. যখন স্বপ্নে পুত্র ইসমাইল আ.কে জবাই করতে দেখেন, তখন বলেছিলেন- “হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তােমাকে জবেহ করছি; এখন তােমার অভিমত কি দেখ। সে বললঃ পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তাই করুন! আল্লাহ চাহে তাে আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহীম তাকে যবেহ করার জন্যে শায়িত করল। তখন আমি তাকে ডেকে বললামঃ হে ইবরাহীম, তুমি তাে স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম যবেহ করার জন্যে এক মহান জন্তু।” (সূরা সাফফাত ১০১-১০৭)

সাধারণের স্বপ্নকে নবীর স্বপ্ন-তুল্য মনে করা অতিমূখতা ও নেহায়েত বােকামি। স্বপ্ন যদি উত্তম হয়, তবে আল্লাহর প্রশংসা ও সুসংবাদ গ্রহণ করা উচিত। মিথ্যা হলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত- ইনশাল্লাহ কোন ক্ষতি হবে না।

মূলনীতিঃ
যে ব্যক্তি নিজেকে মাহদী বলে দাবী করল, অথচ উপরােক্ত গুণাবলী তার মধ্যে পাওয়া যায়নি, দাজ্জাল-ও তার জীবদ্দশায় আবির্ভূত হয়নি- সে মিথুক। যে ব্যক্তি নিজেকে ঈসা বিন মারিয়াম দাবী করল, অথচ তার পূর্বে দাজ্জাল প্রকাশ পায়নি, সেও মিথুক।

নিরপেক্ষ বিবেচনার দাবীঃ
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের কাছে ইমাম মাহদী নিছক মুসলমানদের একজন ইমাম ও ন্যায়পরায়ণ শাসক; এর বেশি কিছু নয়।


মাহদীর আবির্ভাব প্রত্যাখ্যানঃ
ক) ইবনে খালদূন মাহদী বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলাের সমীক্ষা করে ইবনে খালদূন লিখেন- “আমার জানামতে মাহদী সংক্রান্ত প্রায় সকল হাদিস-ই সমালােচনা-যুক্ত।”
খ) মুহাম্মদ রশীদ রেজা তিনি লিখেন- “মাহদী সংক্রান্ত হাদিসগুলােতে পারস্পরিক অসঙ্গতি লক্ষ করা গেছে। সবগুলােতে সামঞ্জস্য বিধান দুষ্কর। প্রত্যাখ্যান কারীদের সংখ্যা ও কম নয়। বুখারী-মুসলিমে ও মাহদী সংক্রান্ত হাদিস বর্ণিত হয়নি। অনেক মনীষী মাহদী বিষয়ের হাদিসগুলােকে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন।
গ) আহমদ আমিন তিনি লিখেন- “মাহদী সংক্রান্ত হাদিস উপকথা বৈ কিছু নয়। মুসলিম সমাজে তদ্দরুন অনেক ভয়াবহ কু-প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।”
ঘ) আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ আলে-মাহমূদ তিনি লিখেন- “মাহদীত্বের দাবী শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিষ্কার মিথ্যা এবং অপবিশ্বাস। এগুলাে রূপকথা বৈ কিছু নয়। পরিকল্পিত এই হাদিসগুলাে সন্ত্রাসের মদদে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে।”
ঙ) মুহাম্মদ ফরীদ ওয়াজদী “মাহদী বিষয়ে কোন হাদিস বর্ণিত হয়নি। সকল গবেষক নবী করীম সা. কে এথেকে পবিত্র ঘােষণা করেছেন। মিথ্যা, রূপকথা, ইতিহাস বিকৃতি ও অতিশয় বাড়াবাড়ি নিয়ে এ সকল জাল হাদিস রচিত হয়েছে। ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে কতিপয় নামধারী প্রবক্তার বরাতে এগুলাের প্রসারণ ঘটেছে।”

তাদের যুক্তিঃ
কোরআনে কারীমে এ সম্পর্কে কিছুই বর্ণিত হয়নি। মাহদীর বিষয়টি সত্য হলে অবশ্যই কোরআনে কারীমে তার বিবরণ থাকত!!?

উত্তরঃ
কোরআনে কারীমে কেয়ামতের সকল নিদর্শন বর্ণিত হয়নি। দাজ্জালের কথা কোরআনে উল্লেখ হয়নি, ভূমিধ্বসের কথা উল্লেখ হয়নি; এ সবই হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ পাক নবীজীর ব্যাপারে বলেছেন- “আর তিনি প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে কোন কথা বলেন না নবী করীম সা. বলেছেন- “আমাকে কোরআন ও তৎসদৃশ বস্তু (হাদিস) দেয়া হয়েছে। সুতরাং বিশুদ্ধ বর্ণনা-সূত্রে কোন হাদিস বর্ণিত হলে অবশ্যই তা গ্রাহ্য হবে।


মাহদী সংক্রান্ত হাদিস বুখারী-মুসলিমে কেন উল্লেখ হয়নি?

উত্তরঃ একথা স্বতঃসিদ্ধ যে, বুখারী এবং মুসলিমে সকল বিশুদ্ধ হাদিসের উল্লেখ হয়নি। ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. ব্যতীত আরও অনেক হাদিস বিশারদ আছেন। তাছাড়া বর্ণনা-সূত্র যাচাই করার বহু মূলনীতি আছে, সেগুলাের বিচারে কোন হাদিস বিশুদ্ধতার গণ্ডিতে পড়লে সহীহাইনে অনুল্লেখ হলেও সেগুলাে গ্রহণযােগ্য হবে। বুখারী-মুসলিমে সরাসরি না এলেও গুণাগুণ সম্বলিত হাদিস ঠিক-ই এসেছে।

মিথুকের জন্য কেন আমরা দরজা খােলা রাখব?!!
উত্তরঃ শরীয়তের দৃষ্টিতে যাচাই করলে দরজা খােলা থাকার প্রশ্নই আসে না। কারণ, মাহদীর দৈহিক গঠন ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপটের বিচারে তা শুধু একক ব্যক্তিত্বের উপরই প্রযােজ্য হয়। আর তিনিই হবেন শেষ জমানার ইমাম মাহদী।

শেষ কথা..
মাহদী আবির্ভাবের দোহাই দিয়ে দাওয়াত ও জিহাদে অবহেলা করা আত্মাহুতি-র নামান্তরঃ ফেতনা-ফ্যাসাদ, অশ্লীলতা, অতিশয় সংঘাত ও কল্যাণের দাওয়াত হ্রাস পাওয়ার ফলে অধিকাংশ মুসলমানের অন্তরে আজ নৈরাশ্যের কালাে ছায়া ভর করেছে। অনেকেই ইমাম মাহদীর অপেক্ষায় প্রহর গুণতে শুরু করেছেন। কেউ দাওয়াত ও জিহাদ ছেড়ে বসে পড়েছেন, কেউ সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ ত্যাগ করেছেন, কেউ ইলমে দ্বীন অন্বেষণ ও প্রচার- প্রসার ছেড়ে ঘরের কোণায় আশ্রয় নিয়েছেন। মনে মনে ভাবছেন যে, সময় কাছিয়ে গেছে। অল্পদিনের ভেতরেই ইমাম মাহদী প্রকাশ পাবে।
- মাহদীর আত্মপ্রকাশ ও আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি।
- ইহুদীদের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ ও চূড়ান্ত বিজয়।
- রােমক (খৃষ্টান)দের বিরুদ্ধে মুসলমানদের যুদ্ধ ও চূড়ান্ত বিজয়... ইত্যাদি।


আমাদের করণীয়..
বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত উপরােক্ত ভবিষ্যদ্বাণীগুলাে মুমিনের জন্য সুসংবাদ এবং মনােবল বৃদ্ধির সহায়ক; এর বেশি কিছু নয় সবসময় আমাদেরকে শরীয়ত মতেই চলতে হবে। ইসলামের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে, মুসলমানদের ভূমিগুলাে শত্রুমুক্ত করতে হবে, জিহাদের বিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে, ইসলামের পতাকা উডডীন করতে সর্বাত্মক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। ঐশী সাহায্যের আশায় ছাতক পাখি হয়ে বসে থাকলে চলবে না। ইহুদীদের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ করতে সকল মুসলমানকে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। মুসলিম ভূ-খণ্ড থেকে দখলদার খৃষ্টান বাহিনী বিতাড়নে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ইমাম মাহদীর অপেক্ষায় লাঞ্ছিত অপদস্থ হয়ে বসে না থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে সকলকে ইসলামের মদদে জান-মাল ব্যয় করতে হবে।
অতঃপর যে কোন মুহূর্তে মাহদী প্রকাশ হলে আমরা তার সাহায্যে এগিয়ে যাব।



মন্তব্য