বাংলা তাফসীর

সূরাঃ আল-ফাতিহা - ১

Alorpath 8 months ago Views:259

সূরাঃ আল-ফাতিহা অনুবাদ ও তাফসির- তাফসীরে জাকারিয়া


. রহমান, রহীম() আল্লাহর নামে()

. সকল হামদ’() আল্লাহর(), যিনি সৃষ্টিকুলের() রব ()

. দয়াময়, পরম দয়ালু()

. বিচার দিনের মালিক()

. আমরা শুধু আপনারই ইবাদাত() করি() এবং শুধু আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি(),

. আমাদেরকে সরল পথের হিদায়াত দিন ()

. তাদের পথ, যাদেরকে আপনি নিয়ামত দিয়েছেন(), যাদের উপর আপনার ক্রোধ আপতিত হয়নি() এবং যারা পথভ্রষ্টও নয়()

. রহমান, রহীম() আল্লাহর নামে()

. সাধারণত আয়াতের অনুবাদে বলা হয়ে থাকে, পরম করুণাময়, দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি অনুবাদ বিশুদ্ধ হলেও এর মাধ্যমে আয়াতখানির পূর্ণভাব প্রকাশিত হয় না কারণ, আয়াতটি আরও বিস্তারিত বর্ণনার দাবী রাখে প্রথমে লক্ষণীয় যে, আয়াতে আল্লাহর নিজস্ব গুণবাচক নামসমূহের মধ্য হতেআর-রাহমান আর-রাহীম দু'টি নামই এক স্থানে উল্লিখিত হয়েছেরহমশব্দের অর্থ হচ্ছে দয়া, অনুগ্রহ এইরহমধাতু হতেইরহমানরহীম' শব্দদ্বয় নির্গত গঠিত হয়েছে রহমান শব্দটি মহান আল্লাহর এমন একটি গুণবাচক নাম যা অন্য কারও জন্য ব্যবহার করা জায়েয নেই (তাবারী) কুরআন হাদীসে এমনকি আরবদের সাহিত্যেও এটি আল্লাহ ছাড়া আর কারও গুণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি পক্ষান্তরেরহীমশব্দটি আল্লাহর গুণ হলেও এটি অন্যান্য সৃষ্টজগতের কারও কারও গুণ হতে পারে তবে আল্লাহর গুণ হলে সেটা যে অর্থে হবে অন্য কারও গুণ হলে সেটা সে একই অর্থে হতে হবে এমন কোন কথা নেই প্রত্যেক সত্তা অনুসারে তার গুণাগুণ নির্দিষ্ট হয়ে থাকে এখানে একই স্থানে দুটি গুণবাচক নাম উল্লেখ করার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে কোন কোন তাফসীরকার বলেছেন যে, আল্লাহরহমানহচ্ছেন এই দুনিয়ার ক্ষেত্রে, আররাহীমহচ্ছেন আখেরাতের হিসেবে [বাগভী]

. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সর্বপ্রথমইকরা বিসমেবা সূরা আল-আলাক এর প্রাথমিক কয়েকটি আয়াত নাযিল হয়েছিল এতে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নাম নিয়ে পাঠ শুরু করতে বলা হয়েছিল সম্ভবত এজন্যই আল্লাহর এই প্রাথমিক আদেশ অনুযায়ী কুরআনের প্রত্যেক সূরার প্রথমেই তা স্থাপন করে সেটাকে রীতিমত পাঠ করার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে বস্তুতঃ বিসমিল্লাহ প্রত্যেকটি সূরার উপরিভাগে অর্থ বাহ্যিক আঙ্গিকতার দিক দিয়ে একটি স্বর্ণমুকুটের ন্যায় স্থাপিত রয়েছে বিশেষ করে এর সাহায্যে প্রত্যেক দুটি সূরার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করাও অতীব সহজ হয়েছে হাদীসেও এসেছে, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরার শেষ তখনই বুঝতে পারতেন যখন বিসমিল্লাহ নাযিল করা হতো” [আবু দাউদ: ৭৮৮] তবে প্রত্যেক সূরার প্রথমে কুরআন পাঠের পূর্বে বাক্য পাঠ করার অর্থ শুধু নয় যে, এর দ্বারা আল্লাহর নাম নিয়ে কুরআন তিলাওয়াতে শুরু করার সংবাদ দেয়া হচ্ছে বরং এর দ্বারা স্পষ্ট কণ্ঠে স্বীকার করা হয় যে, দুনিয়া জাহানের সমস্ত নিয়ামত আল্লাহর তরফ হতে প্রাপ্ত হয়েছে এর মাধ্যমে কথাও মেনে নেয়া হয় যে, আল্লাহ তা'আলা আমাদের প্রতি যে দয়া অনুগ্রহ করেছেন বিশেষ করে দ্বীন শরীয়াতের যে অপূর্ব অতুলনীয় নিয়ামত আমাদের প্রতি নাযিল করেছেন, তা আমাদের জন্মগত কোন অধিকারের ফল নয় বরং তা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার নিজস্ব বিশেষ মেহেরবানীর ফল

সূরাঃ আল-কাউসার

তাছাড়া এই বাক্য দ্বারা আল্লাহর নিকট এই প্রার্থনাও করা হয় যে, তিনি যেন অনুগ্রহপূর্বক তার কালামে-পাক বুঝবার তদনুযায়ী জীবন যাপন করার তওফীক দান করেন ছোট্ট বাক্যটির অন্তর্নিহিত ভাবধারা এটাই তাই শুধু কুরআন তিলাওয়াত শুরু করার পূর্বেই নয় প্রত্যেক জায়েয কাজ আরম্ভ করার সময়ই এটি পাঠ করার জন্য ইসলামী শরীয়াতে নির্দেশ করা হয়েছে কারণ প্রত্যেক কাজের পূর্বে এটি উচ্চারণ না করলে উহার মঙ্গলময় পরিণাম লাভে সমর্থ হওয়ার কোন সম্ভাবনাই থাকে না নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বিভিন্ন কথা কাজে এই কথাই ঘোষণা করেছেন যেমন, তিনি প্রতিদিন সকাল বিকাল বলতেন, بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُআমি সে আল্লাহর নামে শুরু করছি যার নামে শুরু করলে যমীন আসমানে কেউ কোন ক্ষতি করতে পারে না, আর আল্লাহ তো সব কিছু শুনেন সবকিছু দেখেন” [আবু দাউদ: ৫০৮৮, ইবনে মাজাহ: ৩৮৬৯]

অনুরূপভাবে যখন তিনি রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে চিঠি লিখেন তাতে বিসমিল্লাহ লিখেছিলেন [বুখারী, ]

তাছাড়া তিনি যে কোন ভাল কাজে বিসমিল্লাহ বলার জন্য নির্দেশ দিতেন যেমন, খাবার খেতে, [বুখারী ৫৩৭৬, মুসলিম: ২০১৭, ২০২২]

দরজা বন্ধ করতে, আলো নিভাতে, পাত্র ঢাকতে, পান-পাত্র বন্ধ করতে [বুখারী ৩২৮০]

কাপড় খুলতে [ইবনে মাজাহ ২৯৭, তিরমিযী: ৬০৬)

স্ত্রী সহবাসের পূর্বে [বুখারী: ৬৩৮৮, মুসলিম: ১৪৩৪],

ঘুমানোর সময় [আবু দাউদ: ৫০৫৪],

ঘর থেকে বের হতে [আবু দাউদ: ৫০৯৫],

চুক্তিপত্র/ বেচা-কেনা লিখার সময় [সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী: /৩২৮],

চলার সময় হোঁচট খেলে [মুসনাদে আহমাদ: /৫৯],

বাহনে উঠতে [আবু দাউদ: ২৬০২]

মসজিদে ঢুকতে [ইবনে মাজাহ: ৭৭১, মুসনাদে আহমাদ: /২৮৩],

বাথরুমে প্রবেশ করতে [ইবনে আবি শাইবাহ: /১১],

হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করতে [সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী: /৭৯]

যুদ্ধ শুরু করার সময় [তিরমিযী: ১৭১৫]

শক্র দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ব্যাথা পেলে বা কেটে গেলে [নাসায়ী: ৩১৪৯]

ব্যাথার স্থানে ঝাড়-ফুঁক দিতে [মুসলিম: ২২০২]

মৃতকে কবরে দিতে তিরমিযী: ১০৪৬]

ব্যাপারে আরও বহু সহীহ হাদীস এসেছে আবার কোথাও কোথাওবিসমিল্লাহবলা ওয়াজিবও বটে যেমন, যবাই করতে [বুখারী: ৯৮৫, মুসলিম: ১৯৬০]

যেহেতু মানুষের শক্তি অত্যন্ত সীমাবদ্ধ, সে যে কাজই শুরু করুক না কেন, তা যে সে নিজে আশানুরূপে সাফল্যজনকভাবে সম্পন্ন করতে পারবে, এমন কথা জোর করে বলা যায় না এমতাবস্থায় সে যদি আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু করে এবং আল্লাহর অসীম দয়া অনুগ্রহের প্রতি হৃদয়-মনে অকুণ্ঠ বিশ্বাস জাগরুক রেখে তার রহমত কামনা করে, তবে এর অর্থ - হয় যে, সংশ্লিষ্ট কাজ সুষ্ঠুরূপে সম্পন্ন করার ব্যাপারে সে নিজের ক্ষমতা যোগ্যতা তদবীর অপেক্ষা আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের উপরই অধিক নির্ভর ভরসা করে এবং তা লাভ করার জন্য তারই নিকট প্রার্থনা করে



মন্তব্য