মুনাজাত

দু'আর আদব। পর্ব :১

Alorpath 6 months ago Views:162

দু'আর আদব-ফায়সাল বিন আলী আল-বা’দানী


- দুআ করার সময় তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা এবং দৃঢ়তার সঙ্গে দুআ করা :

যদি আল্লাহ সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান থাকে তাঁর কুদরত, মহত্ত্ব, ওয়াদা পালনের প্রতি ঈমান থাকে তাহলে বিষয়টা আয়ত্ব করা সহজ হবে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তোমাদের কেউ রকম বলবে না : হে আল্লাহ আপনি যদি চান তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিন। যদি আপনি চান তাহলে আমাকে অনুগ্রহ করুন। যদি আপনি চান তাহলে আমাকে জীবিকা দান করুন। বরং দৃঢ়তার সঙ্গে প্রার্থনা করবে এবং মনে রাখবে তিনি যা চান তা- করেন, তাকে কেউ বাধ্য করতে পারে না। (বুখারী)

অর্থাৎ আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন তা- করে থাকেন। তাই এভাবে প্রার্থনা বা মুনাজাত করার কোনো স্বার্থকতা নেই যে, আপনি চাইলে করেন। ঠিক এমনিভাবে তার কাছে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রার্থনা করলে তাকে বাধ্য করা হয় না। কেননা তাকে কেউ বাধ্য করতে পারে না। এটা প্রার্থনাকারীসহ সকলে জানে

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন: প্রার্থনা কবুল হবে দৃঢ় বিশ্বাস রেখে তোমরা প্রার্থনা করবে। এবং জেনে রাখ আল্লাহ কোনো উদাসীন অন্তরের প্রার্থনা কবুল করেন না। (তিরমিজী, হাকেম)


-বিনয় একাগ্রতার সঙ্গে দুআ করা এবং আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ তার শাস্তি থেকে বাঁচার প্রবল আগ্রহ নিয়ে দুআ করা :

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: তোমরা বিনীতভাবে গোপনে তোমাদের প্রতিপালকের কাছে দুআ করবে। (আল-আরাফ : ৫৫)

আল্লাহ তাআলা বলেন: তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করে তারা আমার কাছে প্রার্থনা করে আশা ভীতির সঙ্গে এবং তারা থাকে আমার নিকট বিনীত। (আল-আম্বিয়া : ৯০)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআর সময় বিনয়, ভীতি আশা নিয়ে কিভাবে দুআ করতেন তার একটি ছোট দৃষ্টান্ত হাদীসে দেখা যায়: আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. থেকে বর্ণিত যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবরাহীম . এর দুআ সম্পর্কে কুরআনের আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন, হে আমার প্রতিপালক! সকল প্রতিমা তো বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত। এবং তিনি ঈসা . এর দুআ সম্পর্কিত কুরআনের আয়াতটিও তেলাওয়াত করলেন, তুমি যদি তাদের শাস্তি দাও তবে তারা তো তোমারই বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা কর, তবে তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। তিনি দুহাত উপরে তুললেন এবং বললেন, হে আল্লাহ! আমার উম্মত! আমার উম্মত!!’ এবং তিনি কাঁদলেন। আল্লাহ বললেন, হে জিবরীল! তুমি মুহাম্মাদের কাছে যাও, জিজ্ঞেস কর-অবশ্য তোমরা প্রভু ভাল জানেন- তাকে কিসে কাঁদিয়েছে। জিবরীল আসলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন তার কাঁদার কারণ -আল্লাহ তো অবশ্যই জানেন- আল্লাহ বললেন, হে জিবরীল, তুমি মুহাম্মদের কাছে যাও এবং বল, আমি অবশ্যই তার উম্মতের ব্যাপারে তাকে সন্তুষ্ট করব, তাকে ব্যাপারে অসম্মান করব না। (মুসলিম)

-আল্লাহর কাছে অত্যন্ত বিনীতভাবে ধর্না দেয়া এবং নিজের দুর্বলতা, অসহায়ত্ব বিপদের কথা আল্লাহর কাছে প্রকাশ করা :

দেখুন আইউব . কিভাবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন। আল্লাহ সে সম্পর্কে বলেন: এবং স্মরণ কর আইউবের কথা, যখন সে তার প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করে বলেছিল, আমি দুঃখণ্ডকষ্টে পড়েছি, আর তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। (আল-আম্বিয়া : ৮৩)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাকারিয়া . এর প্রার্থনা সম্পর্কে বলেন: সে বলেছিল, হে আমার প্রভু! আমার অস্থি দুর্বল হয়েছে, বার্ধক্যে আমার মস্তক সাদা হয়ে গেছে। হে আমার প্রতিপালক! তোমার কাছে প্রার্থনা করে আমি কখনো ব্যর্থকাম হইনি। আমি আশংকা করি আমার পর আমার সগোত্রীয়দের সম্পর্কে ; আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। সুতরাং তুমি তোমার নিকট হতে দান কর উত্তরাধিকার। (মারইয়াম : -)

ইবরাহীম . এর দুআ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: হে আমাদের রব, নিশ্চয় আমি আমার কিছু বংশধরদেরকে ফসলহীন উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের নিকট বসতি স্থাপন করালাম, হে আমাদের রব, যাতে তারা সালাত কায়েম করে। সুতরাং কিছু মানুষের হৃদয় আপনি তাদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং তাদেরকে রিয্ প্রদান করুন ফল-ফলাদি থেকে, আশা করা যায় তারা শুকরিয়া আদায় করবে।’ (ইবরাহীম : ৩৭)

কুরআন কারীমে ধরনের বহু আয়াত আছে যাতে তুলে ধরা হয়েছে আম্বিয়া আলাইহিমুচ্ছালাম কিভাবে কাতরতা বিনয়ের সঙ্গে নিজেদের করুণ অবস্থা আল্লাহর কাছে তুলে ধরেছেন। মুমিনদের কর্তব্য ঠিক এমনিভাবে আল্লাহর কাছে দুআ প্রার্থনা করা

হাদিসের পরিভাষা

-দুআয় আল্লাহর হামদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ পেশ করা :

দুআর শুরুতে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ পড়া দুআ কবুলের সহায়ক বলে হাদীসে এসেছে।ফুযালা ইবনু উবাইদ রা. থেকে বর্ণিত যে, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখলেন এক ব্যক্তি দুআ করছে কিন্তু সে দুআতে আল্লাহর প্রশংসা রাসূলের প্রতি দরূদ পাঠ করেনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে বললেন, সে তাড়াহুড়ো করেছে। অতঃপর সে আবার প্রার্থনা করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে অথবা অন্যকে বললেন, যখন তোমাদের কেউ দুআ করে তখন সে যেন আল্লাহ তাআলার প্রশংসা তার গুণগান দিয়ে দুআ শুরু করে। অতঃপর রাসূলের প্রতি দরূদ পাঠ করে। এরপর যা ইচ্ছা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। (আবু দাউদ তিরমিজী)

() আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ তাঁর মহৎ গুণাবলি দ্বারা দুআ করা :

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাকে সে সকল নাম দিয়ে প্রার্থনা করবে। (আল-আরাফ : ১৮০)

আল্লাহ তাআলার সুন্দর নাম মহান গুণাবলির মাধ্যমে দুআ করার কথা আল-কুরআনে হাদীসে বহু স্থানে এসেছে। যেমন ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত :নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতে যখন তাহাজ্জুদ পড়তে দাঁড়াতেন তখন বলতেন, হে আল্লাহ আপনারই প্রশংসা, আকাশমণ্ডলী পৃথিবীসমূহে তাতে যা কিছু আছে আপনি তার জ্যোতি। আপনারই প্রশংসা, আকাশমণ্ডলী পৃথিবীসমূহে এবং তাতে যা কিছু আছে আপনি তার ধারক। আপনারই প্রশংসা, আপনি সত্য, আপনার ওয়াদা সত্য, আপনার কথা সত্য, আপনার সঙ্গে সাক্ষাত সত্য, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, কিয়ামত সত্য, নবীগণ সত্য, মুহাম্মদ সত্য। হে আল্লাহ! আপনার কাছেই আত্মসমর্পন করেছি। আপনার ওপরই নির্ভর করেছি। আপনার প্রতি ঈমান এনেছি। আপনার দিকে ফিরে এসেছি। আপনার জন্য বিবাদ করেছি। আপনাকেই বিচারক মেনেছি। অতএব আপনি আমার পূর্ব পরের গোপন প্রকাশ্যের পাপগুলো ক্ষমা করে দিন। আপনি শুরু আপনি শেষ। আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। (বুখারী মুসলিম)

হাদীসে দেখা গেল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআয় কিভাবে আল্লাহর গুণগান করছেন। আল্লাহর সুন্দর নামগুলো উল্লেখ করেছেন

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন শুনলেন এক ব্যক্তি সালাতে আত্তাহিয়্যাতুর বৈঠকে বলে দুআ করছে: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি- আপনি তো এক; অদ্বিতীয়, যিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও কেউ জন্ম দেয়নি। কেউ নেই তাঁর সমকক্ষ- আপনি আমার পাপগুলো ক্ষমা করুন। আপনি পরম ক্ষমাশীল দয়াময়

প্রার্থনা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে! তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। (আবু দাউদ, নাসায়ী ইবনু খুযাইমা)

উল্লেখিত ব্যক্তি আল্লাহর সুন্দর নাম গুণাবলির মাধ্যমে দুআ করার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ কবুলের সংবাদ দিলেন

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরেক ব্যক্তিকে দেখলেন সালাতে তাশাহহুদে সে বলে দুআ করছে: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি - কথার উসীলায় যে, সকল প্রশংসা আপনার, আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনি দানশীল, আকাশমন্ডলী পৃথিবীর স্রষ্টা, হে মহিমময় মহানুভব! হে চিরঞ্জীব সর্ব সত্তার ধারক!- আপনার কাছে জান্নাত চাচ্ছি এবং মুক্তি চাচ্ছি জাহান্নাম থেকে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রার্থনা শুনে তার সাহাবীদের বললেন: তোমরা কি জানো, সে কি দিয়ে দুআ করেছে? তারা বললেন, আল্লাহ তার রাসূল ভাল জানেন। তিনি বললেন: সে আল্লাহর মহান নাম দিয়ে দুআ করেছে। যে ব্যক্তি নামের মাধ্যমে দুআ করবে তার দুআ তিনি কবুল করবেন। (অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে ইসমে আজম দিয়ে দুআ করেছে)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ইউনূছ . এর প্রার্থনা -যখন তিনি মাছের পেটে ছিলেন- তুমি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই তুমি পবিত্র, মহান! আমি তো সীমালংঘনকারী। যে কোনো মুসলিম কথা দিয়ে প্রার্থনা করবে তার প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করবেন। (তিরমিজী)

- পাপ গুনাহ স্বীকার করে প্রার্থনা করা :

যেমন হাদীসে এসেছে: সাদ্দাদ বিন আউস রা. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, সেরা ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনার বাক্য) হল তুমি এভাবে বলবে, হে আল্লাহ! তুমি আমার প্রতিপালক। তুমি ছাড়া সত্যিকার কোনো মাবুদ নেই। তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছে। আর আমি তোমার বান্দা। তোমার সঙ্গে কৃত ওয়াদা প্রতিশ্রুতির ওপর আমি আমার সাধ্যমত অটল রয়েছি। আমি যা কিছু করেছি তার অপকারিতা হতে তোমার আশ্রয় নিচ্ছি। আমার প্রতি তোমার যে নিআমত তা স্বীকার করছি। আর স্বীকার করছি তোমার কাছে আমার অপরাধ। তুমি আমাকে ক্ষমা কর। তুমি ছাড়া আর কেউ ক্ষমা করতে পারে না

যে সকালে দৃঢ় বিশ্বাসে এটা পাঠ করবে সে যদি ওই দিনে সন্ধ্যার পূর্বে মৃত্যু বরণ করে তাহলে সে জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর যদি দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে সন্ধ্যায় পাঠ করে, এবং সকাল হওয়ার পূর্বে সে ইন্তেকাল করে তাহলে সে জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (বুখারী)

হাদীসে ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বোত্তম ইস্তেগফার শিক্ষা দিয়েছেন। তাতে প্রার্থনাকারী নিজ পাপ স্বীকার করে প্রার্থনা করছেন। এবং প্রার্থনা কবুল হওয়ার সুসংবাদও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিয়েছেন



মন্তব্য