মুনাজাত

দু'আর আদব। পর্ব : ২

Alorpath 6 months ago Views:146

দু'আর আদব-ফায়সাল বিন আলী আল-বা’দানী


দু'আর আদব। পর্ব :১

- প্রার্থনাকারী নিজের কল্যাণের দুআ করবে নিজের বা কোনো মুসলিমের অনিষ্টের দুআ করবে না :

নিজের কল্যাণের জন্য দুআ করলে তা কবুল হওয়ার ওয়াদা আছে আর অকল্যাণ বা পাপ নিয়ে আসতে পারে এমন দুআ করলে তা কবুল হবে না বলে হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যখন কোনো মুমিন ব্যক্তি দুআ করে, যে দুআতে কোনো পাপ থাকে না আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় থাকে না তাহলে আল্লাহ তিন পদ্ধতির কোনো এক পদ্ধতিতে তার দুআ অবশ্যই কবুল করে নেন। যে দুআ সে করেছে হুবহু সেভাবে তা কবুল করেন অথবা তার দুআর প্রতিদান আখেরাতের জন্য সংরক্ষণ করেন কিংবা দুআর মাধ্যমে তার দিকে আগুয়ান কোনো বিপদ তিনি দূর করে দেন। কথা শুনে সাহাবাগণ বললেন, আমরা তাহলে অধিক পরিমাণে দুআ করতে থাকবো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তোমরা যত প্রার্থনাই করবে আল্লাহ তার চেয়ে অনেক বেশি কবুল করতে পারেন। (বুখারী : আল-আদাবুল মুফরাদ আহমদ)

তিনি আরো বলেন: বান্দার দুআ কবুল হয় যদি তাতে পাপ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা না থাকে।’ (মুসলিম)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন: তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে দুআ করবে না, নিজেদের সন্তানদের বিরুদ্ধে দুআ করবে না এবং নিজেদের সম্পদের বিরুদ্ধে দুআ করবে না। (মুসলিম)

-সৎকাজের অসীলা দিয়ে দুআ করা

যেমন সহীহ হাদীসে বিপদগ্রস্ত তিন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যারা এক ঝড়-বৃষ্টির রাতে পাথর ধসে পড়ার কারণে পাহাড়ের গুহায় আটকে পড়েছিল। তারা তখন প্রত্যেকে নিজ নেক আমলের অসীলা দিয়ে প্রার্থনা করেছিল। একজন মাতা-পিতার উত্তম সেবার কথা বলেছিল। দ্বিতীয়জন ব্যভিচারের সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও কাজ থেকে বিরত থেকে ছিল। তৃতীয় জন এক ব্যক্তির আমানত রক্ষা তাকে ফেরত দিয়েছিল। এরা প্রত্যেকে বলেছিল, হে আল্লাহ আমি যদি কাজটি আপনাকে সন্তুষ্ট করার জন্য করে থাকি তাহলে কাজের অসীলায় আমাকে নিশ্চিত মৃত্যুর বিপদ থেকে উদ্ধার করুন। আল্লাহ তিনজনের প্রার্থনাই কবুল করে তাদের বিপদ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। (বুখারী মুসলিম)

হাদীসে দেখা যায় যে নেক আমলের অসীলা দিয়ে দুআ করলে দুআ কবুল হয়


-বেশি বেশি করে বার বার দুআ প্রার্থনা করা:

যেমন হাদীসে এসেছে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: তোমাদের কেউ যখন দুআ করে সে যেন বেশি করে দুআ করে কেননা সে তার প্রভুর কাছে প্রার্থনা করছে। (মুসলিম)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন: বান্দার দুআ কবুল করা হয় যদি সে দুআতে পাপ অথবা আত্মীয়তার সম্পর্কের ছিন্ন করার কথা না বলে এবং তাড়াহুড়ো না করে। জিজ্ঞেস করা হল হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াহুড়ো বলতে কি বুঝায়, তিনি বললেন, দুআতে তাড়াহুড়া হল, প্রার্থনাকারী বলে আমিতো দুআ করলাম কিন্তু কবুল হতে দেখলাম না। ফলে সে নিরাশ হয় দুআ করা ছেড়ে দেয়। (মুসলিম)

দুআ কবুল হতে না দেখলে নিরাশ হওয়া উচিৎ নয়। কারণ মুমিন ব্যক্তির দুআ কখনো বৃথা যায় না

১০- সুখে দুঃখে সর্বাবস্থায় দুআ করা:

মানুষ কখনো সুখের সময় অতিবাহিত করে কখনো দুঃখের সময়। অনেক মানুষ এমন আছে যারা শুধু বিপদে পড়ে আল্লাহকে ডাকেন প্রার্থনা করেন। আবার অনেকে এমন আছেন যারা বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকতে ভুলে যান। কিন্তু সত্যিকার মুমিন ব্যক্তি সুখে দুঃখে সর্বদা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে থাকেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে চায়, আল্লাহ বিপদ-মুসীবতে তার প্রার্থনা কবুল করুন সে যেন সুখের সময় আল্লাহর কাছে বেশি করে প্রার্থনা করে। (তিরমিজী হাকেম)

১১- দুআর বাক্য তিনবার করে উচ্চারণ করা:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি পথ-নির্দেশ হল তিনি কোনো কোনো দুআর বাক্য তিনবার করে উচ্চারণ করতেন। যখন মুশরিকরা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সালাতাবস্থায় উটের নাড়ী-ভুঁড়ি তাঁর পিঠের ওপর রাখল তখন তিনি সালাত শেষ করে দুআ করলেন এভাবে :হে আল্লাহ কুরাইশদের তুমি পাকড়াও করো ! হে আল্লাহ কুরাইশদের তুমি পাকড়াও করো !! হে আল্লাহ কুরাইশদের তুমি পাকড়াও করো !!! অতঃপর তিনি তাদের নাম উল্লেখ করলেন: হে আল্লাহ তুমি পাকড়াও কর আমর বিন হিশামকে, উতবা বিন রাবীয়াকে, শাইবা বিন রবীয়াকে, অলীদ বিন উতবাকে, উমাইয়া বিন খালাফকে, উতবা বিন আবি মুয়ীত এবং আম্মারা বিন অলীদকে। আব্দুল্লাহ বলেন, বদর যুদ্ধের দিন সকল লোকদের লাশ পড়ে থাকতে দেখলাম। অতঃপর এদের লাশগুলোকে টেনে বদরের কূপে নিক্ষেপ করা হল। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: কূপবাসীর ওপর অভিশাপ অব্যাহত থাকবে। (বুখারী)

দুআর বাক্য তিনবার করে উচ্চারণ করলে প্রার্থনাকারীর মনোযোগ একাগ্রতা বেশি হয় যা দুআ কবুলে সহায়ক হয়

মোনাজাত কবুলের অন্তরায়সমূহ

১২- দুআয় উচ্চস্বর পরিহার করা

অনেক মানুষকে দেখা যায় তারা দুআ করার সময় স্বর উচু করেন বা চিৎকার করে দুআ করেন। এটা দুআর আদবের পরিপন্থী। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: তোমরা বিনীতভাবে গোপনে তোমাদের প্রতিপালকের কাছে দুআ কর; তিনি সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না। (আল-আরাফ : ৫৫)

আয়াতে গোপনে দুআ করতে বলা হয়েছে এবং দুআয় সীমালংঘন সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে

প্রায় সকল তাফসীরবিদের অভিমত হল আয়াতে সীমালংঘনকারী বলতে তাদের বুঝানো হয়েছে যারা উচ্চ আওয়াযে দুআ করে

আল্লাহ তাআলা নবী যাকারিয়া . এর প্রশংসায় বলেছেন: যখন সে তার প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করেছিল নিভৃতে। (মারইয়াম:০৩)

আয়াতে গোপনে দুআ করতে বলা হয়েছে এবং দুআতে সীমালংঘন থেকে সতর্ক করা হয়েছে

অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হে মানবসকল! তোমরা নিজেদের ব্যাপারে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর। তোমরা কোনো বধির বা অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছ না। তোমরাতো ডাকছ এমন সত্তাকে যিনি সর্বশ্রোতা অতি নিকটে এবং তোমাদেরই সঙ্গে। (বুখারী মুসলিম)

যখন একদল সাহাবী উচ্চ আওয়াযে দুআ করছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথা বলেছিলেন

১৩- দুআ- প্রার্থনার পূর্বে অযু করা:

আবু মুছা আল-আশআরী রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দুআ করতে ইচ্ছা করলেন তখন পানি চাইলেন, অযু করলেন অতঃপর দুহাত তুলে বললেন: হে আল্লাহ! তুমি কিয়ামতে তাকে অনেক মানুষের উপরে স্থান দিও। আমি বললাম আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! তুমি আব্দুল্লাহ ইবনু কায়েসের পাপ ক্ষমা কর তাকে সম্মানিত স্থানে প্রবেশ করিও। (বুখারী মুসলিম)

হাদীসে দেখা গেল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করার পূর্বে অজু করে নিলেন

ইবনু হাজার রহ. বলেন, হাদীস দ্বারা আমরা জানলাম যে, দুআ করার পূর্বে অজু করে নেয়া মুস্তাহাব। (ফাতহুল বারী)

১৪- দুআয় দুহাত উত্তোলন করা:

যেমন হাদীসে এসেছে ইবনু উমার রা. বলেন: নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুহাত তুললেন এবং বললেন, হে আল্লাহ! খালেদ যা করেছে আমি সে ব্যাপারে তোমার কাছে দায়িত্বমুক্ত।দুবার বললেন। (বুখারী)

আবু মুছা রা. বলেন, অত:পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু হাত তুললেন এবং বললেন, হে আল্লাহ! তুমি উবাইদ আবি আমেরকে ক্ষমা করে দিও। তিনি এতটা হাত তুললেন যে আমি তার বগলের শুভ্রতা দেখতে পেলাম। (বুখারী)

১৫- কিবলামুখী হওয়া:

দুআর সময় কিবলামুখী হওয়া মুস্তাহাব। যেমন হাদীসে এসেছে: আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবার দিকে মুখ করলেন এবং কতিপয় কুরাইশ নেতাদের বিরুদ্ধে দুআ করলেন। (বুখারী মুসলিম)



মন্তব্য