ইসলামের বিধি নিষেধ

প্রশ্নোত্তর। পর্ব ১৩

Alorpath 6 months ago Views:119

প্রশ্নোত্তর। পর্ব ১৩


প্রশ্নোত্তর। পর্ব ১২

(৬২) হাদীছ থেকে সিফাতে ফেলীয়া বা কর্মগত গুণের কতিপয় উদাহরণ দিন?

 

কুরআন মাজীদের ন্যায় হাদীছেও আল্লাহ্ তাআলার সিফাতে ফেলীয়ার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘‘আমাদের মহান প্রভু আল্লাহ্ তাআলা রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেনঃ কে আমার নিকট দু করবে? আমি তার দু কবুল করবো কে আমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবে? আমি তাকে দান করব কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব’’

 

শাফাআতের হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “অতঃপর আল্লাহ্ তাআলা তাদের নিকট সেই আকৃতিতে আসবেন, যাতে তারা চিনতে পারবে আল্লাহ বলবেনঃ আমি তোমাদের প্রভু তারা বলবেঃ আপনি আমাদের প্রভু’’

এখানে সিফাতে ফেলীয়া দ্বারা আল্লাহর আগমণ উদ্দেশ্য আল্লাহর আকৃতি উদ্দেশ্য নয় সুতরাং ভালভাবে বুঝা উচিৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেনঃ ‘‘কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী থাকবে তাঁর মুঠোতে এবং আসমানসমূহ থাকবে তাঁর ডান হাতে অতঃপর তিনি বলবেনঃ আমিই বাদশা’’

 নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেনঃ ‘‘আল্লাহ তাআলা যখন সৃষ্টিজীব সৃষ্টি করলেন, তখন নিজ হাতে লিখে দিলেন যে, আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর জয়লাভ করেছে’’

আদম মুসা (আঃ)এর পরস্পর ঝগড়ার হাদীছে এসেছেঃ ‘‘অতঃপর আদম (আঃ) বললেনঃ আপনি মুসা আপনাকে বাক্যালাপের জন্য লোকদের মধ্যে হতে মনোনিত করেছেন এবং নিজ হাতে তিনি আপনার জন্য তাওরাত কিতাব লিপিবদ্ধ করেছেন’’

এখানে আল্লাহর বাক্যালাপ তাঁর হাত- এটি সিফাতে জাতিয়া তথা সত্বাগত গুণ কথা বলা একই সাথে আল্লাহর সিফাতে জাতিয়া (সত্বাগত গুণ) সিফাতে ফেলীয়া (কর্মগত গুণ) আর তাওরাত লিখা আল্লাহর কর্মগত গুণ

আল্লাহ্ তাআলা রাতের বেলা তাঁর হাত প্রসারিত করে রাখেন, যাতে দিনের বেলায় অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিগণ তাওবা করে এমনিভাবে দিনের বেলা স্বীয় হাত প্রসারিত করে দেন, যাতে রাতের বেলার অপরাধীগণ তাওবা করে

 

(৬৩) আল্লাহ্ তাআলার প্রত্যেক সিফাতে ফেলীয়া হতে কি নাম নির্ধারণ করা জায়েয? না কি নামগুলো আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে?

 

প্রত্যেক সিফাতে ফেলীয়া হতে নাম নির্বাচন করা জায়েয নেই কেননা নামগুলো আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে তাঁর নাম সেগুলোই, যা তিনি কুরআন মজীদে উল্লেখ করেছেন কিংবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহীহ হাদীছে বর্ণনা করেছেন

আল্লাহ্ তাআলা যে সমস্ত কর্ম নিজের সত্বার জন্য সাব্যস্ত করেছেন, তাতে রয়েছে তাঁর পরিপূর্ণতা প্রশংসার বর্ণনা। তবে আল্লাহ তাআলা সর্বদা কর্মগুলো দ্বারা নিজেকে বৈশিষ্টমন্ডিত করেন নি এবং সেগুলো থেকে আল্লাহর নাম নির্বাচন করাও জায়েয নেই।

আল্লাহর কর্মসমূহের মধ্যে এমন কতিপয় কর্ম রয়েছে, যা দ্বারা আল্লাহ্ তাআলা সদা গুণান্বিত। যেমন আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ ‘‘আল্লাহই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন অতঃপর তোমাদেরকে রিযিক দিয়েছেন অতঃপর তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন অতঃপর তিনিই তোমাদেরকে জীবিত করবেন’’ (সূরা রূমঃ ৪০)

উক্ত কর্মগুলো থেকে আল্লাহ্ তাআলা নিজেকে خَالِق (সৃষ্টিকারী), رَازِق (রিযিক দাতা), المُحِيْ (জীবন দানকারী) এবং المُمِيت (মৃত্যু দাতা) হিসাবে নাম করণ করেছেন

অপর পক্ষে আল্লাহ তাআলার এমন কতিপয় কর্ম রয়েছে, যা স্বীয় সত্ত্বার জন্য প্রতিদান অন্য একটি ক্রিয়ার মুকাবেলায় ব্যবহার করেছেন। সুতরাং যেখানে তিনি তা ব্যবহার করেছেন, সেখানে উক্ত ক্রিয়া ব্যবহার করার কারণে তাঁর পূর্ণতা প্রশংসা বুঝায়; অন্যত্র নয়। যেমন আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ ‘‘নিশ্চয়ই মুনাফেকরা আল্লাহর সাথে প্রতারণা করে এবং তিনিও তাদেরকে প্রতারণা প্রত্যার্পণ করেন’’ (সূরা নিসাঃ ১৪২)

আল্লাহ্ তাআলা আরও বলেনঃ ‘‘এবং তারা ষড়যন্ত্র করেছিল আর আল্লাহও সুক্ষ্ম কৌশল করলেন আল্লাহই শ্রেষ্ঠতম কৌশলী’’ (সূরা আল-ইমরানঃ ৫৪)

আল্লাহ্ তাআলা আরও বলেনঃ ‘‘তারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে সুতরাং আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গিয়েছেন’’ (সূরা তাওবাঃ ৬৭) কিন্তু স্মরণ রাখা আবশ্যক যে, উক্ত ক্রিয়াসমূহ আয়াতে বর্ণিত স্থানসমূহ ব্যতীত অন্য কোন স্থানে আল্লাহর জন্য ব্যবহার করা জায়েয নেই সুতরাং কথা বলা যাবে না যে, আল্লাহ ষড়যন্ত্র করেন, প্রতারণা করেন এবং ঠাট্টা করেন অনুরূপভাবে সমস্ত ক্রিয়া থেকে আল্লাহর নাম বাহির করাও জায়েয নেই সুতরাং বলা যাবে না যে, তিনি مَاكِر (ষড়যন্ত্রকারী), مُخَادِع (প্রতারণাকারী) এবং مُسْتَهْزِي (বিদ্রুপকারী) কোন জ্ঞানবান মুসলিম ধরণের বিশ্বাস পোষণ করতে পারে না আল্লাহ্ তাআলা স্বীয় সত্বাকে ষড়যন্ত্র, কৌশল এবং প্রতারণা ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত করেন নি তবে যারা অন্যায়ভাবে ষড়যন্ত্র, কৌশল এবং প্রতারণা করে থাকে, প্রতিদান স্বরূপ আল্লাহও তাদের সাথে ষড়যন্ত্র, কৌশল এবং প্রতারণা করে থাকেন ইহা জানা কথা যে, মানুষ যদি ইনসাফের সাথে উপরোক্ত কাজগুলোর শাস্তি দেয়, তাহলে সকলেই তাকে ভাল মনে করে

যিনি সকল বস্ত্তর সৃষ্টিকারী, মহাজ্ঞানী, ন্যায়বিচারক এবং প্রজ্ঞাময় তিনি যদি উপরোক্ত নিকৃষ্ট কাজগুলোর শাস্তি বিনিময় প্রদান করেন তাহলে তাঁর কাজগুলো উত্তমভাবেই প্রশংসনীয় হবে

কতিপয় দুআ ও যিক্‌র

(৬৪) আল্লাহ্ তাআলার নাম العَلِي (সমুন্নত) الأَعْلَى (সর্বোচ্চ) এবং অর্থে অন্যান্য নাম যেমন الظَاهِر (প্রকাশমান), القَاهِر (পরাক্রমশালী) এবং المُتَعَالِي (সুউচ্চ) ইত্যাদি কোন্ জিনিষের প্রমাণ বহন করে?

 

আল্লাহ্ তাআলার নাম العَلِي الأَعْلَى সমস্ত সিফাতের প্রমাণ বহন করে, যা তা থেকে নির্গত আর তা সকল দিক থেকেই আল্লাহ্ তাআলা মাখলুকের উপরে হওয়ার প্রমাণ বহন করে তিনি আরশের উপর সমুন্নত, সমস্ত মাখলুকের উপরে বিরাজমান, স্বীয় সত্বায় মাখলুক থেকে আলাদা, মাখলুকের সকল অবস্থা পর্যবেক্ষণকারী, তাদের সকল অবস্থা সম্পর্কে অবগত এবং জ্ঞানের মাধ্যমে সবকিছুকে বেষ্টন করে আছেন এবং সৃষ্টিজীবের কোন কিছুই তাঁর নিকট গোপন নয়

অনুরূপভাবে তিনি ক্ষমতা প্রতিপত্তির দিক থেকে সকল মাখলুকের উপরে হওয়ার অর্থ হলঃ তাঁকে পরাজিত করার বা তাঁর উপর বিজয়লাভকারী কেউ নেই, তাঁর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, নেই কোন বিরোধী এবং তাঁকে প্রতিহত করার মতও কেউ নেই। প্রত্যেক বস্ত্তই তাঁর মহত্বের সামনে মস্তক অবনতকারী, তাঁর সম্মানের সামনে সকল বস্ত্তই পদদলিত, তাঁর বড়ত্বের সামনে সকলেই অক্ষম অসহায় এবং সব কিছুই তাঁর পরিচালনা ক্ষমতাধীন এবং কেউ তাঁর আয়ত্তের বাইরে নয়

তাঁর মর্যাদা অতি উঁচু হওয়ার অর্থ এই যে, সকল প্রকার পরিপূর্ণ গুণ তাঁর জন্য নির্ধারিত, সকল প্রকার দোষ ত্রুটি থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত পবিত্র। তিনি অতি সম্মানিত, বরকতময় সুউচ্চ

(৬৫) আল্লাহ তাআলা উপরে আছেন- কুরআন মজীদ থেকে কথার দলীল দিন

 

আল্লাহ্ তাআলা যে উপরে সমুন্নত, ব্যাপারে কুরআনের সুস্পষ্ট দলীলগুলো গণনা করে শেষ করা যাবে না উপরে বর্ণিত নামগুলো এবং অর্থে বর্ণিত অন্যান্য নামগুলো থেকে তা সহজেই অনুধাবন করা যায় আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ ‘‘দয়াময় আল্লাহ আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন’’ (সূরা তোহাঃ )

অর্থে কুরআন মজীদে সাতটি আয়াত রয়েছে

() আললাহ তাআলা বলেনঃ ‘‘দয়াময় আল্লাহ্ আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন’’ (সূরা তোহাঃ )

 

() আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘‘নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তিনি আসমান-যমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন (সূরা রাফঃ ৫৪)

 

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘‘নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তিনি আসমান-যমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন’’ (সূরা ইউনূসঃ )

 

() আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘‘আল্লাহই ঊর্ধবদেশে আকাশমন্ডলী স্থাপন করেছেন বিনা স্তম্ভে তোমরা এটা দেখছো অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন’’ (সূরা রাদঃ )

 

() আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘‘অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন’’ তিনি পরম দয়াময় (সূরা ফুরকানঃ ৫৯)

 

() আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘‘আল্লাহই আকাশ-যমিন এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সকল বস্ত্ত ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন’’ (সূরা সাজদাহঃ ৫৪)

 

) আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘‘আল্লাহই আকাশ-যমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন (সূরা হাদীদঃ )

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘‘তোমরা কি নিরাপত্তা পেয়ে গেছো যে, আকাশে যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদেরকে সহ ভূমিকে ধ্বসিয়ে দিবেন না? (সূরা মুল্কঃ ১৬)

আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ ‘‘তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, যিনি তাদের উপরে আছেন’’ (সূরা নাহ্লঃ ৫০)

আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ ‘‘তাঁরই দিকে পবিত্র বাক্যসমূহ আরোহণ করে এবং সৎকর্ম তাকে উন্নীত করে’’ (সূরা ফাতিরঃ ১০)

আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ ‘‘ফেরেশতা এবং রূহ (জিবরীল) তাঁর দিকে উর্ধ্বগামী হয়’’ (সূরা মাআরেজঃ )

 

আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ ‘‘আল্লাহ্ তাআলা আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সকল বিষয় পরিচালনা করেন’’ (সূরা সিজদাহঃ )

আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ ‘‘যখন আল্লাহ বললেনঃ হে ঈসা! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মৃত্যু দান করব অতঃপর তোমাকে আমার দিকে উঠিয়ে নিবো’’ (সূরা আল-ইমরানঃ ৫৫) আল্লাহ্ তাআলা উপরে আছেন- মর্মে আরো অনেক দলীল রয়েছে



মন্তব্য