ইসলামের বিধি নিষেধ

প্রশ্নোত্তর। পর্ব ১৬

Alorpath 6 months ago Views:160

প্রশ্নোত্তর। পর্ব ১৬


প্রশ্নোত্তর। পর্ব ১৫

(৭২) তাওহীদুল আসমা ওয়াস্ সিফাতের বিপরীত কি?

 

তাওহীদুল আসমা ওয়াস্ সিফাতের বিপরীত হচ্ছে, আল্লাহর নাম, গুণাবলী আয়াতসমূহ অস্বীকার করা এবং তার মধ্যে إلحاد ইলহাদ বা পরিবর্তন করা ইলহাদ তিন প্রকার যথাঃ

() আইয়্যামে জাহেলিয়াতের মুশরিকদের ইলহাদ। তারা আল্লাহর নামগুলো স্বীয় স্থান থেকে পরিবর্তন করেছে এবং তার মধ্যে বাড়িয়ে বা তার মধ্যে হতে কিছু কমিয়ে তা দ্বারা তাদের দেবতাদের নাম রেখেছে। যেমন আল্লাহর নাম ‘اله-ইলাহহতে (لات-লাত) বানিয়েছে, عزيز-(আযীয) হতে عزى-(উয্যা) বানিয়েছে এবং (منان-মান্নান) হতে (منات-মানাত) বানিয়েছে

() মুশাবিবহা তথা উপমা পেশকারী সম্প্রদায়ের ইলহাদ। তারা আল্লাহ্ তাআলার সিফাতগুলোর ধরণ বর্ণনা করেছে এবং সেগুলোকে মাখলুকের সিফাতের মতই বলেছে। আর এটি হচ্ছে মুশরিকদের ইলহাদের বিপরীত। মুশরিকরা তাদের দেবতাসমূহকে মহান রাববুল আলামীনের সমকক্ষ মনে করত। আর এরা আল্লাহ্কে মাখলুকের স্তরে নামিয়ে দিয়েছে এবং আল্লাহর সিফাতগুলো মানুষের সিফাতের মত বলে আখ্যা দিয়েছে। আল্লাহ্ এদের কথার অনেক উর্ধে

() মুআত্তিলা সম্প্রদায় তথা আল্লাহর সিফাত অস্বীকারকারীদের ইলহাদ। এরা দুই প্রকার। তাদের একদল আল্লাহ্ তাআলার নামগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে। কিন্তু আল্লাহর সুন্দর নামগুলো যেসমস্ত পরিপূর্ণ সিফাত বা গুণকে আবশ্যক করে, তা অস্বীকার করেছে। ফলে তারা আল্লাহ্কে রহমতহীন রাহমান অর্থাৎ দয়াহীন দয়াবান, জ্ঞানহীন জ্ঞানী, শ্রবণ শক্তিহীন শ্রবণকারী, দৃষ্টিহীন দ্রষ্টা এবং ক্ষমতাহীন ক্ষমতাবান হিসাবে নির্ধারণ করেছে। বাকি নামগুলোর ক্ষেত্রেও অনুরূপ করেছে

তাদের অন্য একটি দল সুস্পষ্টভাবে আল্লাহর নামগুলোকে তাঁর সিফাতে কামালিয়াগুলো সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাদের কথা হচ্ছে আল্লাহর নাম সিফাত কোনটিই নেই। তাদের কথা শুধু অস্তিত্বহীন বস্ত্তর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে

আল্লাহ্ তাআলা নাস্তিক যালেমদের সমস্তত কথার অনেক উর্ধে পবিত্র। আললাহ্ তাআলা বলেনঃ ‘‘তিনি নভোমন্ডল, ভূমন্ডল এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবার পালনকর্তা সুতরাং তাঁরই এবাদত করুন এবং তাতে দৃঢ় থাকুন আপনি কি তার সমান কাউকে জানেন’’? (সূরা মারইয়ামঃ ৬৫)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেনঃ ‘‘কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয় তিনি শুনেন এবং দেখেন’’ (সূরা শুরাঃ ১১)

আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ ‘‘তাদের সম্মুখের পশ্চাতের সবই তিনি অবগত আছেন তারা তাঁকে জ্ঞান দ্বারা পরিবেষ্টিত করতে পারেনা ’’ (সূরা তোহাঃ ১১০)


(৭৩) প্রত্যেক প্রকারের তাওহীদের একটি কি অন্যটিকে আবশ্যক করে? তাওহীদের কোন এক প্রকারের বিরোধী বিষয় কি সকল প্রকার তাওহীদের পরিপন্থী?

 

হ্যাঁ, তাওহীদের সকল প্রকারই একটি অন্যটির জন্য আবশ্যক সুতরাং যে ব্যক্তি কোন একটিতে শরীক করবে, সে অবশিষ্ট প্রকারগুলোতেও মুশরিক হিসাবে গণ্য হবে তার উদাহরণ হল, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের কাছে দু করা এবং অন্যের কাছে এমন কিছু প্রার্থনা করা, যা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কেউ দিতে পারে না মনে রাখা দরকার যে, দু শুধু এবাদতই নয়; বরং এবাদতের মূল আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো কাছে দু করা তাওহীদের উলুহিয়্যাহ তথা এবাদতের মধ্যে শির্ক আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কেউ প্রয়োজন পূর্ণ করতে পারে, বিশ্বাস রেখে কারো কাছে কোন কল্যাণ প্রার্থনা করা বা অকল্যাণ দূর করার আবেদন করা তাওহীদে রুবুবিয়াতে শির্ক করার অন্তর্ভূক্ত কেননা বিশ্বাসের মাধ্যমে সে আল্লাহর রাজত্বে অন্য কাউকে কর্তৃত্ব করার অধিকার প্রদান করল সে এই বিশ্বাসের কারণেই আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যের কাছে দু করে যে, সে যার কাছে দুআ করছে, সে দূরে, নিকটে, সকল সময়ে, সকল স্থানেই তার দু শুনছে আর এটিই হচ্ছে তাওহীদুল আসমা ওয়াস্ সিফাতের ক্ষেত্রে শির্ক কেননা সে আল্লাহ্ তাআলা ছাড়া অন্যের জন্যে এমন শ্রবণশক্তি নির্ধারণ করল, যা সকল বস্ত্তকে বেষ্টন করে আছে দূরত্ব বা নিকটত্ব তার শ্রবণকে বাঁধাগ্রস্ত করতে পারে না সুতরাং আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নিকট দু করাতে তাওহীদে উলুহিয়্যায় শির্ক, তাওহীদে রুবুবিয়ায় শির্ক এবং তাওহীদুল আসমা ওয়াস্ সিফাতেও শির্ক তথা তাওহীদের সকল প্রকারেই শির্ক হয়ে গেল

 

(৭৪) ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনয়ন করা আবশ্যক- এই মর্মে কুরআন হাদীছ থেকে দলীল দিন

 

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনয়ন করা আবশ্যক- মর্মে কুরআন হাদীছে অসংখ্য দলীল বিদ্যমান আমরা এখানে কয়েকটি দলীল বর্ণনা করব

 

আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ ‘‘ফেরেশতারা তাদের প্রতিপালকের প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করে এবং জগৎবাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন’’ সূরা শুরাঃ )

 

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘‘যারা তোমার প্রভুর সান্ন্যিধ্যে রয়েছে তারা তাঁর এবাদত করতে অহংকার করেনা এবং স্মরণ করেন তারা তাঁরই গুণাগুণ মহিমা প্রকাশ করে এবং তারা তাঁকেই সিজদা করে’’ (সূরা রাফঃ ২০৬)

 

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণের, তাঁর রাসূলগণের, জিবরীলের এবং মিকাঈলের শত্রু হয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ সেসব কাফেরের শত্রু’’ (সূরা বাকারাঃ ৯৮)

 

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনয়নের ব্যাপরে হাদীছে জিবরীল অন্যতম যা ইতিপিূর্বে উল্লেখিত হয়েছে জিবরীল (আঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বললেনঃ আমাকে ঈমান সম্পর্কে কিছু বলুন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেনঃ ‘‘তুমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে () আল্লাহ পাকের উপর () তাঁর ফেরেস্তাদের উপর () তাঁর কিতাবসমূহের উপর () তাঁর রাসূলদের উপর () আখিরাত বা শেষ দিবসের উপর এবং () তাকদীরের ভাল-মন্দের উপর’’

 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেনঃ ‘‘ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ্ তাআলা নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন’’[2] ফেরেশতাদের ব্যাপারে আরো অনেক হাদীছ বর্ণিত হয়েছে

হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি। পর্ব :১ 

(৭৫) ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনয়নের অর্থ কি?

 

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনয়নের অর্থ হচ্ছে তাদের অস্তিত্বের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা এবং আরো বিশ্বাস করা যে, তারা আল্লাহর সৃষ্টিসমূহের অন্যতম সৃষ্টি তারা আল্লাহর প্রতিপালনাধীন এবং তাঁরই অধিনস্ত

আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ ‘‘তারা আল্লাহর সম্মানিত বান্দা আল্লাহর আগে বেড়ে কথা বলতে পারে না এবং তারা তো তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করে থাকে’’ (সূরা আম্বীয়াঃ ২৬-২৭)

 

আল্লাহ তাআলা আরও বলেনঃ ‘‘তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে না এবং তাঁরা যা করতে আদিষ্ট হন, তাই করেন’’ (সূরা তাহরীমঃ )

আল্লাহ তাআলা আরও বলেনঃ ‘‘তারা অহংকার বশে তাঁর এবাদত করতে বিমুখ হয় না এবং তাঁরা ক্লান্তি বোধ করে না তারা দিবারাত্রি তাঁর পবিত্রতা মহিমা বর্ণনা করেন এবং তাঁরা ক্লান্ত হন না’’ (সূরা আম্বিয়াঃ ১০-২০) অর্থাৎ তাঁরা আল্লাহর এবাদত করতে বিরক্তি ক্লান্তি বোধ করে না

 

(৭৬) ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে তৈরী করেছেন এবং তাদেরকে যে কাজে নিয়োজিত করেছেন, সে অনুসারে কয়েক প্রকার ফেরেশতার বর্ণনা দিন?

 

দায়িত্ব কর্তব্য পালনের দিক থেকে ফেরেশতাগণ কয়েকভাবে বিভক্ত () ফেরেশতাদের কেউ রাসূলদের নিকট অহী নিয়ে আসার দায়িত্বে নিয়োজিত তিনি হলেন রূহুল আমীন জিবরীল (আঃ)

() কেউ বৃষ্টি বর্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত। তিনি হলেন মীকাঈল (আঃ)

() কেউ শিঙ্গায় ফুঁ দেয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত। যেমন ইসরাফীল (আঃ)

() কেউ আবার রূহ কবয করার দায়িত্বে নিয়োজিত। তিনি হলেন মালাকুল মাওত তাঁর সাথীগণ

() কোন কোন ফেরেশতা বান্দার আমলসমূহ লিখার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। তাঁরা হলেন কিরামুন কাতিবুন

() তাদের কেউ বান্দাকে তার সম্মুখ পশ্চাৎ দিক থেকে হেফাজতের দায়িত্বে নিয়োজিত। তারা হলেন পরপর আগমণকারী ফেরেশতাগণ

() তাদের কেউ জান্নাত তার নেয়ামতের দায়িত্বে নিয়োজিত। যেমন রিযওয়ান ফেরেশতা তাঁর সাথীগণ

() তাদের কেউ জাহান্নাম তার আযাবের প্রহরী হিসাবে নিয়োজিত। তিনি হলেন মালেক এবং দোযখের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতাগণ। তাদের নের্তৃস্থানীয়দের সংখ্যা উনিশজন

() তাদের কেউ কেউ কবরের আযাবের দায়িত্বে নিয়োজিত তারা হলেন মুনকার নাকীর

(১০) তাদের কেউ আল্লাহর আরশ বহনের দায়িত্বে নিয়োজিত

(১১) তাদের কাউকেকারুবীয়ূনবলা হয়। তাঁরা আল্লাহর আরশের চারপাশে সদা তাসবীহ পাঠের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন

(১২) তাদের কেউ মার্তৃগর্ভে রূহ ফুৎকার, মার্তৃগর্ভে মানব দেহ গঠন এবং তাতে যা লিখতে বলা হয় তা লিখার দায়িত্বে নিয়োজিত

(১৩) তাদের কেউ কেউ বাইতুল মামুরে প্রবেশ করেন। তাতে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে। যারা একবার প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে, কিয়ামতের পূর্বে দ্বিতীয়বার আর তারা তাতে প্রবেশের সুযোগ পাবে না

(১৪) কিছু ফেরেশতা এমন আছেন, যারা পৃথিবীতে ভ্রমণ করে এবং যিকিরের মজলিস খুঁজে বেড়ায়

(১৫) অগণিত ফেরেশতা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁরা কখনও ক্লান্তি বোধ করে না

(১৬) আরো এমন ফেরেশতা আছেন, যারা রুকূ সিজদায় পড়ে আছে। তারা কখনও মাথা উত্তোলন করে না

উল্লেখিত ফেরেশতাগণ ছাড়াও আরো অসংখ্য ফেরেশতা আছে। আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ ‘‘আপনার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন এটা তো (জাহান্নামের বর্ণনা) মানুষের জন্য উপদেশ ছাড়া অন্য কিছু নয়’’ (সূরা মুদ্দাচ্ছিরঃ ৩১) ফেরেশতাদের প্রকারভেদ এবং তাদের কাজ সম্পর্কে কুরআন সুন্নাতে আরো অগণিত দলীল রয়েছে



মন্তব্য